Read in English

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের শীর্ষ দশ কারণ

June 18, 2025 3:56 pm

মুখবন্ধ

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে যে একটি অনেক বড় ঘটনা শুধু তা-ই না। এটা সারা বিশ্বের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে।

রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিবেচনায় গবেষণা ও পাঠক্রমে এই নাটকীয় পতনের মূল কারণগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি। আপাতদৃষ্টিতে হাসিনা সরকার এক মজবুত আইনী কাঠামোতেই ক্ষমতাসীন বলে মনে হয়েছিল এবং তাঁর চিরাচরিত শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ দলবল নিয়ে পাঁচ বছরের জন্য নতুন মেয়াদের যাত্রা সবে শুরু করেছিল। তারপরও এ সরকারের পতন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে নয়, বরং বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী সমাজের আন্দোলন থেকে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রূপ নিয়ে একটি আকস্মিক ও অচিন্তনীয় পরিণতির সম্মুখীন হয়েছিল।

এই পতন কি শুধুমাত্র ক্ষণস্থায়ী গণঅসন্তোষের ফল ছিল, যা ছাত্র বিক্ষোভ দ্বারা প্রজ্বলিত হয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ অতিব্যবহার দ্বারাই তীব্রতর হয়েছিল?

২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থায় মাঝারি ধরনের সংস্কারের দাবিতে সৃষ্ট সহিংস রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নিঃসন্দেহে এই পরিবর্তনের সূচনাকাল ছিল। যা একটি নিতান্তই ছাত্রদের চাকরিতে নিয়োগ সংক্রান্ত বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু অতি দ্রুত তা হাসিনার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহে পরিণত হয়ে গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতা থেকে পলায়নে পর্যবসিত হয়েছিল। কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আছে কি? আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কড়া নজরদারির মধ্যে এই লৌহমানবী কেন স্নায়ুর এই চাপ সামলাতে পারলেন না?

 

ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ, পুলিশ এবং ক্ষমতাসীনদের মাত্রাতিরিক্ত বর্বরতা, বিতর্কিত নির্বাচনসমুহ এবং সেনাবাহিনীর দ্বিধান্বিত ভূমিকা - এই প্রত্যক্ষ কারণগুলোই সবার মনে ঠাই নিবে প্রাথমিকভাবে। নিঃসন্দেহে, এগুলো তার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এগুলো কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এই আকস্মিক পতনের মূল অন্তর্নিহিত কাঠামোগত কারণগুলো - এবং কীভাবে এগুলো প্রকাণ্ড এক বিস্ফোরকসম ভাবে একত্রিত হয়েছিল - তার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন।

এই নিবন্ধে আমরা এমন দশটি অন্তর্নিহিত কারণ অন্বেষণ করব, গভীর চিন্তা ও তথ্যপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর আশায়। এই দশটি কারণের বাইরেও কারণ থাকতে পারে। এই গ্রন্থটি অবশ্য এই দশটি অন্তর্নিহিত কারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এই বিবেচনায় যে অন্যান্য সব কারণ এগুলোর অধীনেই পড়বে। তারপরও পাঠকদেরকে মনে উদ্রেক হোক সেই কারণগুলো যেগুলো শেখ হাসীনার স্বৈরশাসনের আকস্মিক পতনকে নিশ্চিত করেছে। ক্ষুদ্র দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে এই লেখাটিতে পাঠকদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বৃহৎ পরিসরের সেই কাঠামোগত কারনগুলোকে নির্ণয় করতে এবং সেই একই ভঙ্গিতে এই লেখাটির সমালোচনা করতে যাতে এরকম স্বৈরশাসককে এই পৃথিবীতে সহজেই চিহ্নিত করা যায়।

চলুন শুরু করি শেষ কারনটা থেকে।

post-ads

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #১০
সামরিক বাহিনীতে অনাস্থা

সামরিক বাহিনীর অনাস্থা: শেখ হাসিনার পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
এটিই বরং গুণীজনদের কাছে শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার পতনের সবচেয়ে নির্ধারক কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁরা ভাবতে পারেন, প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিশেষ করে সেনা বাহিনী, বিগড়ে গেছে তাই শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। হ্যাঁ, প্রধানতম দশটি কারনের দশম কারন হিসেবে বিবেচনা করছি এই আলোচনায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘকাল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও, হাসিনা সশস্ত্র বাহিনীর সাথে সরাসরি কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেননি। তার সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ ছিল কেবলমাত্র কয়েকজন ব্যক্তির মাধ্যমে, যা উভয়পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছিল। যদিও তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সেবা নিয়মিত নিতেন, তবুও তিনি তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখতেন। ফলে তার ১৫ বছরের শাসনামলে এই সম্পর্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফাটল দেখা দেয়।

সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্কের প্রথম ফাটল

হাসিনার প্রথম মেয়াদ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০৯ সালে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) বিদ্রোহ ঘটে—একটি সহিংস ও অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান, যাতে ৭৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৫৭ জনই ছিলেন সেনা কর্মকর্তা। সশস্ত্র বাহিনীর অনেকেই হাসিনার প্রতিক্রিয়াকে অত্যধিক সন্দেহজনক ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদী বলে মনে করেছিলেন। এই ধারণা যে, সরকার দৃঢ়ভাবে ব্যবস্থা নেয়নি, বা এমনকি এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে দিয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে একটি গভীর বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি করে। এই ঘটনাটি ছিল একটি গভীর অবিশ্বাসের সূচনা, যা তার শাসনামল জুড়ে বাড়তে থাকে।

সশস্ত্র বাহিনীতে রাজনীতিকরণ

ঐতিহ্যগতভাবে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী সর্বদা অরাজনৈতিক এবং এর সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরন নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত। হাসিনার শাসনামলে এই নীতি ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে। বিশেষ করে, মসনদে আসীন আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে নীতিবহির্ভূতভাবে নিয়োগের মাধ্যমে বাহিনীর ভেতর রাজনীতিকরণের ঠেকানো যায়নি। সামরিক বাহিনীর মেধাভিত্তিক কাঠামো ক্ষুণ্ণ হয়, যেখানে পেশাদারিত্বের চেয়ে চাটুকারিতাকে পুরস্কৃত করা হতো।

পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগগুলো যখন দক্ষতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে হতে থাকে, তখন বাহিনীর অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি হয়। মেধাবী কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা হতাশায় ভুগতে থাকেন, যাদের ক্যারিয়ার রাজনৈতিকভাবে পছন্দনীয় কিন্তু কম যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য স্থবির হয়ে যায়। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে—এই ধারণা ব্যাপক অসন্তোষ ও ঐক্যহীনতা তৈরি করে।

পররাষ্ট্রনীতি ও বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ

ভারতের সাথে হাসিনার নৈকট্য—প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ট্রানজিট চুক্তি ও কূটনৈতিক অবস্থান—সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আরও একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, যারা সর্বদা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তারা হাসিনার ভারতের স্বার্থে অত্যধিক ছাড় দেয়াকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে।

সামরিক প্রশিক্ষণ, কৌশল এবং এমনকি শিক্ষামূলক আলোচনায় হঠাৎ ভারতকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা—যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে ভারতকে একটি সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অস্বাভাবিক—যা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে। সামরিক মহলে গুঞ্জন ওঠে যে, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের জন্য ভারতীয় প্রতিনিধিদের অনানুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন, যা প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসাবে হাসিনার কর্তৃত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, যিনি পুরো সময়টাতেই বেশ বিতর্কিত ছিলেন, সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর একটা কোন পদক্ষেপের নাম উল্লেখ করা সম্ভব না যেটা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে তিনি করেছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন আল জাজিরার একটি তদন্তে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নিয়োগ, দুর্নীতি এবং অপেশাদার কর্মকাণ্ড  নিয়ে অপ্রিয় তথ্য প্রকাশিত হয়, যাকে অনেকে ভারতের অনুগত সেনাপ্রধান বলে সেই প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়। সরকার এই ধরনের খবর দমন করার চেষ্টা করলে জনসাধারণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। এমন ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের সেনা প্রধান হন তবে দেশের সার্বভৌমত্ব বলতে আর কিছু থাকে না।

নির্বাচনী কারচুপি ও সেনাবাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ

২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল যে, স্বচ্ছ ও ন্যায্য নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ২০%-এর বেশি আসন পাবে না। বাংলাদেশের নির্বাচনী নিরাপত্তা বিধানে, সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার ঐতিহ্য রয়েছে, যার মাধ্যমে সেনাবাহিনী জনগণের আস্থা অর্জন করেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

কিন্তু শেখ হাসিনা পক্ষপাতদুষ্ট পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তায় সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপি করলে, সশস্ত্র বাহিনী গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়। অনেক মধ্যপদস্থ কর্মকর্তা এটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকার অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখেন। গণতান্ত্রিক নীতি রক্ষায় আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি হয়। ভোটার হিসেবে, সেনাসদস্যরা এই পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি—যা ছিল তাদের নীরব সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত, যা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় এই অসন্তোষ সক্রিয় বিরোধিতায় রূপ নেয়। ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, সেনাবাহিনী এবার নির্বাচনী কারচুপিকে বৈধতা দিতে রাজি হয়নি। সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া এই বিভাজনকে আরও গভীর করে।

"নখ-দন্তহীন বাঘ" সমালোচনা

আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ—মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ এবং ভারত ও মিয়ানমারের আঞ্চলিক প্রভাব মেনে নেয়া—এর মুখে সেনাবাহিনীর "নখ-দন্তহীন" ভাবমূর্তিও সেনাবাহিনীর ভিতরে এবং বাহিরে আস্থাহীনতা তৈরি করে, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা সদস্যদের মধ্যে। প্রতিরক্ষাবাহিনীর ধারণা হয় যে সরকার জাতীয় প্রতিরক্ষা ইস্যুগুলিতে উদাসীন এবং সামরিক বাহিনী একপ্রকার মূল্যহীন।

এই "নখ-দন্তহীন বাঘ" হওয়ার অনুভূতি সেনাবাহিনীর মধ্যে হতাশা তৈরি করে, বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক মহল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে সমালোচনা শুরু করে। কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করতেন যে, সুযোগ পেলেই শেখ হাসিনার সরকার প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা করছিলেন। বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বার্থ জোরালোভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া, ফলে জাতীয় গর্ব ও নিরাপত্তা যে ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল তা সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। আর এভাবে চলতে থাকলে, প্রতিরক্ষার যেমন কিছু থাকবে না তেমনি প্রতিরক্ষা বাহিনীরও কোন প্রয়োজনীয়তা থাকবে না।

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড ও সামরিক প্রতিক্রিয়া

৩১ জুলাই ২০২০ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যাকাণ্ড একটি যুগান্তকারী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে পুরো সামরিকবাহিনী জুড়ে। পুলিশের গুলিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু চাকুরীরত ও সাবেক সামরিক ব্যক্তিদের মনে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার করে। এটি পুলিশের ক্রমবর্ধমান অযাচিত হস্তক্ষেপ ঔদ্ধত্যের  প্রতীক হয়ে ওঠে। বি ডি আর হত্যাকাণ্ডের পর মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড এটা আর বুঝাতে বাকি রাখেনি যে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা নিজেদের সরকারযন্ত্র দ্বারা একরকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে। তাই তাঁরা এতে বেশি ক্ষুব্ধ হন। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা চাকুরীরত কর্মকর্তাদের উপর ব্যপক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করেন, যারা অনেকেই একাডেমীতে তাদের প্রাক্তন সামরিক প্রশিক্ষকও বটে।

২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, স্পষ্ট করে দেয় যে, বাহিনীর নীরব অসন্তোষ এখন প্রকাশ্য অবাধ্যতায় রূপ নিয়েছে। এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে বিদেশি গোষ্ঠী—বিশেষ করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো—বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও বিতর্কিত করার চক্রান্ত করছে। এতে অনেক সামরিক কর্মকর্তারা আরও শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে পড়েন।

আন্তর্জাতিক চাপ ও ভাবমূর্তির ঝুঁকি

পশ্চিমা সরকারগুলো যখন হাসিনা প্রশাসনের উপর গণতন্ত্র বিলুপ্তি ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য চাপ বাড়ায়, তখন সেনাবাহিনী নির্লিপ্তভাবে সরকারের সহযোগী হিসেবে রাস্তায় নামে । জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হুমকির মুখে পড়ে এবং সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এটি ইতোমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক-সামরিক সম্পর্ককে আরও টানাপোড়েনে ফেলে।

চূড়ান্ত বিচ্ছেদ: সামরিক বনাম রাজনৈতিক টানাপড়েন

২০২০ থেকে সামরিক বাহিনী হাসিনার প্রতি নীরবে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। RAB এর উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এটা বেশ স্পষ্ট হতে থাকে। সামরিক বাহিনী এরকম ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামোর একটি সরকারের সাথে তাঁরা নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেললে তাদের নিজেদের সুনাম যে হারাতে পারে সেই বোধোদয় হতে থাকে। আর এই হাসিনা সরকারকে টিকে থাকতে হলে নিজদের জনগণের উপর নজরদারি, জবরদস্তি ও উচ্চমাত্রার নিয়ন্ত্রনের উপর ভরসা করেই টিকে থাকতে হবে। ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের সময় শেখ হাসিনা সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে সেনাবাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে দাড় করাতে চাইলে, তারা তাই অস্বীকৃতি জানায়। সেনাবাহিনীর বৃহদাংশ যাদের রক্ষা করাই বরং তাদের দায়িত্ব বলে মনে করে, সেই জনগণের বিরুদ্ধে রাইফেল তাক করতে রাজি হয়নি। তাদের এই অস্বীকৃতি শেখ হাসিনার উস্কে দেয়া একটি সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ থেকে দেশকে রক্ষা করে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভিত্তি—যা তথ্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আনুগত্য ও ভারতীয় সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল—সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়ে, তার সরকার সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। উপায়ন্তর না দেখে পতনের দিকেই ধাবিত হয় শেখ হাসিনার সরকার।

post-ads

Exclusive: Bangladesh army refused to suppress protest, sealing Hasina's fate

This article is an immediate analysis by the global news media. Interestingly, this analysis is composed in Delhi. Hence the writers could not undermine the perceptions brewing among the Indian think tanks on the backdrop of the Western understanding.

The Reuters

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৯
সার্বভৌমত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

সার্বভৌমত্ব নিয়ে সংশয়ের আমল (২০০৯–২০২৪)

শেখ হাসিনার শাসনামলে (২০০৯–২০২৪) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ঘরে-বাইরে নিরন্তর সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দেশের সার্বভৌমত্বের ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তখনই যখন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-তে নিয়োজিত ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বিডিআর সৈনিকদের বিদ্রোহ বলে এটাকে ধামাচাপা দেবার একটি তড়িঘড়ি প্রক্রিয়া থেকেই এই ধারণা দানা বাধতে থাকে যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়া শুরু করেছে মাত্র।

 রহস্যজনকভাবে, সরকার কিছু অপতথ্যের মাধ্যমে এটা দেখাবার চেষ্টা করেছিল যে এটা একটি  স্বতঃস্ফূর্ত সেনা বিদ্রোহ। প্রকৃতপক্ষে, সামরিক ও বেসামরিক উভয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের কাছে অচিরেই এই ভয়াবহ সত্যটি উন্মোচিত হতে থাকে যে, এটি কোনো সাধারণ বিদ্রোহের দুর্ঘটনা ছিল না। বরং প্রাথমিক  তদন্ত ও তথ্য-প্রমাণে বাংলাদশ ও ভারত উভয় দেশেরই গোয়েন্দা এবং ছায়া-রাস্ট্রযন্ত্র এতে জড়িত থাকার আলামত উঠে আসে। তাই হয়ে থাকলে, এটা ছিল সুপরিকল্পিত এক জঘন্য প্রকল্প যার মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করার জন্য আঁকা দুরভিশন্দি ছক। বাংলাদেশের আইনে সেনাবিদ্রোহ হলো রাষ্ট্রদ্রোহ—অতীব গুরুতর অপরাধ। তাই সেই সুযোগে দেশ প্রেমিক ও নিষ্ঠাবান বি ডি আর সেনাদেরকেও বিচারের নামে নিঃশেষ করে ফেলাটাও সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিল। এসব ঘটনার পর শেখ হাসিনার সাথে এর যোগসূত্রগুলো কেমন যেন দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাবার মতো হয়ে যাচ্ছিল। হত্যাযজ্ঞ যে ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন তার চেয়ে গুরুত্বর অভিযোগ ছিল অপরাধীদের দেশ ছেড়ে পালাতে দেয়া; আর এসময় এটাও চাউর করা হয় যে, যেকোনো মুহূর্তে ভারতীয় সমরবাহিনী আক্রমন করতে পারে বাংলাদেশকে, শুধু শেখ হাসিনাকে উদ্ধারের জন্য। পরবর্তীতে যখন তদন্তে  পাওয়া অত্যন্ত গোপন প্রমাণাদি, সাক্ষী-সবুদ, সব কোন  যাদুবলে উধাও হয়ে যায় তখন আর বুঝতে জাতির বাকি থাকে না যে রাষ্ট্রের অন্দরমহলেই ঘটেছে সার্বভৌমত্বের হত্যা।

কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখে জাতিঃ  

এই ঘটনা জাতিকে যে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল সেগুলো এরকম:

· সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা যদি নিজদেশে নিজেরাই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে কে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে?

· যদি সার্বভৌমত্বের রক্ষকরা একে অপরকে বিশ্বাসই না করতে পারে, তাহলে তারা কীভাবে রাষ্ট্র রক্ষা করবে?

· কার স্বার্থ রক্ষার্থে সামরিক বাহিনীর ভেতরের একটা অংশ সক্রিয়ভাবে সত্য গোপন করতে চেয়েছিল?

 মূলত, এইসব সন্দেহগুলো একটিই অভিশপ্ত প্রশ্নে রূপ নিয়েছিল: শেখ হাসিনা সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার শপথ নিয়ে বরং তা জলাঞ্জলি দেবার সাথে জড়িত ছিলেন? কারন, আমরা দেখতে পাই ২০১২ সালের পর হতেই বিদেশি আধিপত্য বিস্তার লাভ করে বিশেষ করে ভারত, চীন, মিয়ানমার এবং যুক্তরাষ্ট্রের। এবং জাতীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ভৌগোলিক স্বাধীনতা একে একে বিপন্ন হতে থাকে বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানের মাধ্যমে।

শেখ হাসিনা সার্বভৌমত্বের ফেরিওয়ালা নিজেই কি তাঁর পতন ডেকে আনে?

 বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে যে দুটি বিষয় বেশ লক্ষণীয় ছিল: ১) এটি দেশের সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে দিয়েছিল এবং ২) সীমানাকে অরক্ষিত করে তুলেছিল। পক্ষান্তরে সেই সুযোগে তৈরি হলো ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। প্রথমে একধরনের ভারততোষণ নীতি গ্রহণ করে রাষ্ট্রের জনগণের কাছে ভারতকে এক বিশাল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

পরক্ষনেই, বুঝা যায় যে এটা কেবলই একটা ছল-চাতুরী,  কারন ২০১৪ সাল থেকেই দেখা যায় ভারত নির্লজ্জভাবে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ, তথা শেখ হাসিনার প্রতিনিধির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ভারতের বাংলাদেশের নির্বাচনী সততা ধ্বংস করার জন্য স্পষ্ট সমর্থন সন্দেহাতীত প্রমাণ করে ভারত কোনদিনই এদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হতে পারবে না। আওয়ামী লীগ যেন তাদের কেনা দলে পরিণত হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ এবং ভারত দুই স্বত্বাই একাকার হয়ে গেছে। পরবর্তী দশকে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৃত্যুকে উভয় দেশের জন্য মঙ্গল হিসেবে প্রকাশ করতে ভারতীয় প্রচারযন্ত্র মাঠে নেমে পড়ে দেশে বিদেশে, যা শেখ হাসিনাকে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিতর্কিত বিজয় নিশ্চিত করে পক্ষান্তরে একপ্রকার অবৈধ সরকারে পরিণত করেছিল। এমন অবৈধ সরকারের মাধ্যমে অনেক অনৈতিক সুবিধা আদায় করা সহজ হবে ভেবে, গোপন অপারেশন তো দূরের কথা, ভারতের হস্তক্ষেপ ছিল একটি প্রকাশ্য আলাপ। আওয়ামী লীগের কর্তাব্যক্তিদের সময় সময় বিভিন্ন ভাষণ, বক্তৃতা, বিবৃতি, আলাপচারিতা, উক্তিতে উঠে আসে তাদের সেই ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার কথা। শেখ হাসিনা নিজেও ভারতীয় স্বার্থের সাথে তার সরকারের সমন্বয় গোপন করার চেষ্টা করেননি, জাতীয় প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিষয়ে নয়া-দিল্লীকে অভূতপূর্ব প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন—অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র বেদীর বিস্ময়কর চরম অবমাননা।

 অপরপক্ষে, বাংলাদেশের স্বার্থে শেখ হাসিনা যেন এক নির্মম তামাসায় মেতে উঠেছিলেন। হাসিনা সরকার ও ভারত যতোই ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল, ততোই বাংলাদেশের জন্য বহুদিনের গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো যেমন, ভারতের বিএসএফ দ্বারা সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন বিরোধ এবং চরম অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক, ইত্যাদি অপমানজনক উদাসীনতার সাথে উপেক্ষা করা হয়েছিল। সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য এটি কূটনীতির ব্যর্থতা নয়; এটি ছিল জাতীয় মর্যাদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। এতে যে ক্ষোভের জন্ম হয় তাঁর বহিঃপ্রকাশ করার অধিকারও এদেশের মানুষের ছিল না। সেই ক্ষোভের কথা লিখতে গিয়ে ছাত্রলীগের সদস্যরা প্রাণ কেড়ে নেয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের। এতে জনঅসন্তোষ তুঙ্গে উঠে যায় ২০১৯ সাল থেকে যা আজও বিদ্যমান।

 ২০১৬ সালের মধ্যে শেখ হাসিনা যখন তার সব বিরোধীকে প্রায় দমন করে ফেলেছিলেন এবং তাঁর ভারতীয় আধিপত্য সুসংহত করার পথে কোনো বাধা ছিল না, তখন তার সরকার এমন কিছু অর্থনৈতিক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে যাতে নয়া-দিল্লীর স্বার্থই একচেটিয়া প্রাধান্য পায়। এই সময় থেকে বাংলাদেশের প্রধান সরকারি অফিসগুলোর কাছে ভারতীয় কম্পানিগুলকে কাজ দেবার নির্দেশনা আসার অভিযোগ উঠছিল। ভারতীয় ব্যবসাকে প্রাধান্য দেবার জন্য ভারতীয় গোয়েন্দাদের মাত্রাতিরিক্ত তৎপরতা এবং অভ্যন্তরীণ শাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপের খবর  আর মানুষের কাছে অজানা থাকেনি।

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার মনস্তত্ত্বে ভারতে হস্তক্ষেপ আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করেছিল রাষ্ট্রকে। ব্যাপক ব্যাংক তছরুপ - যার মধ্যে পিকে হালদারের ১ বিলিয়ন ডলার কেলেঙ্কারি উল্লেখযোগ্য, যে ভারতেই পালিয়েছিল - তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম অসহায়ত্বকে উন্মোচন করে দেয়। বারবার প্রত্যর্পণ অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা আর্থিক অপরাধীদের আশ্রয়দানে তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। কল্পনা করুন, যদি কোন ভারতীয় অপরাধী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসে, বাংলাদেশ কি তাকে নিরাপদ আশ্রয় দেবে? আর যদি সেই ব্যক্তি মুসলিম ধর্মের হয়? প্রশ্নই ওঠে না, তাই না?

২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক হ্যাকিং, যেখানে SWIFT সিস্টেমের মাধ্যমে ৮০ মিলিয়ন ডলার চুরির ঘটনাটা আজও অমীমাংসিত। বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা বাংলাদেশ ব্যঙ্কের অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় সার্ভার বিশেষজ্ঞদের সাথে এর উদ্বেগজনক যোগসূত্র প্রকাশ পাওয়া গেলেও রহস্যজনকভাবে এর তদন্ত এগুওনি। আশ্চর্যজনকভাবে, বড় অপরাধ - প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, অপহরণ, হত্যা এবং হয়রানি - প্রায়শই আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক থেকে উৎসারিত হতে দেখা যেতো, যেখানে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ হয়তো কখনো সহায়ক, কখনো বা অসহায় অবস্থায় থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।

প্রশাসনে বিদেশি প্রভাব ও সুশাসনের অধঃপতন

 বাহ্যিক চাপে—বিশেষ করে ভারতের—সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন, প্রেষণ, পদোন্নতি ও পদাবনতি একটি প্রকাশ্য গোপন বিষয়ে পরিণত হয় ২০১৬ সাল থেকে, যা দেশপ্রেমিক সরকারি কর্মকর্তাদের মনোবল ধ্বংস করে দেবার জন্য তাঁরা তাদের কোণঠাসা করার ব্যবস্থা করেছিল এক প্রকার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, যাতে তাদের অনুগত কর্মকর্তারা ভারতের অনুকুলে রাষ্ট্রের চুক্তিগুলো করে দেয় সহজে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানী খাতে এধরনের ফরমায়েশি চুক্তির কারনে আজও বাংলাদেশকে ক্ষতির হিসাব গুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশের আমলাদের জন্য এটা সত্যি বেশ দুরূহ ব্যপার হয়ে দাঁড়ায় যে আসলে কে তাদের কর্তৃপক্ষ। এভাবে রাষ্ট্রের সমুদয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েতে পড়তে একটা দুঃসহ অবস্থায় উপনিত হয় ২০২৩ সালের মধ্যে, আর সেই সাথে এদেশের অর্থনীতিও।

 প্রতিরক্ষা খাতে এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছে। 

৫ অক্টোবর ২০২২-এ গ্রিসের কাভালায় ইউক্রেনীয় অ্যান্টোনভ এএন-১২ কার্গো বিমানের বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় বেরিয়ে আসে যে বিমানটি সার্বিয়া থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে ১১.৫ টন সার্বিয়ান-নির্মিত মর্টার শেল এবং ডিটোনেটর বহন করছিল। কাগজে-কলমে সার্বিয়া বাংলাদেশের সাথে এই অস্ত্র বিক্রয় নিশ্চিত করলেও ঢাকা সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে।

 বিমান দুর্ঘটনার কারনে ফাঁস হয়ে যাওয়া এই ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ায় অস্পষ্ট অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা, বিশেষত বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। আশ্চর্যজনকভাবে, এই খবরটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে দ্রুত হারিয়ে যায়, হয় দমন করা হয়েছিল অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের অনেকেই যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়তো জড়িত না থাকলেও, আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কগুলি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রচ্ছদকে বাংলাদেশের অজান্তে ব্যবহার করেছে সেটাই একটা হুমকি। অসমর্থিত সুত্র  দাবি করে যে, এই নিষিদ্ধ চালানটি আসলে ভারতের উদ্দেশ্যে পাঠানো হচ্ছিল, যা এই অঞ্চলের  অস্ত্র কালোবাজারি বাণিজ্যে জটিল সমীকরণ তৈরি করে।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অফিসারদের সুকৌশলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হতো বা বরখাস্ত করে ফেলা হতো যাতে বিদেশীদের স্বার্থে কোন ব্যঘাত না ঘটে। একজন সাধারণ মেজর জিয়া ক্যু করে ফেলছে বলে এক প্রহসন চাউর করা হয় সেনা অফিসারদের ভীতি প্রদর্শন করার জন্য। নীতিবান দলীয় নেতাদের তুলনায় নমনীয় অনুগতদের বেশি অগ্রাধিকার পাওয়া এটা বলে দেয় যে রাষ্ট্র চলে যাচ্ছিল দুর্বৃত্তদের কব্জায়। যদি রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে কে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে?

ভূ-রাজনৈতিক দাবার চাল

শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের প্রশাসন, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। নয়া-দিল্লী নিজেকে শেখ হাসিনার সরকারের "গুরু" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল ঠিকই, বিশেষ করে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে। কিন্তু ভারতের চিরশত্রু চীনের আধিপত্য বিস্তার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অনুপ্রবেশকে এক রকম দেখেও না দেখার ভান করেছিল। চীনের "ঋণের ফাঁদে” যে বাংলাদেশ আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে তাতে ভারতের কোন কিছু যায় আসে না, কারন বাংলাদেশের যেকোন উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, এমনকি বেইজিংয়ের শর্তে হলেও, বাণিজ্য, রেমিট্যান্স, টাকা পাচারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতকেই লাভবান করবে।

তাই এব্যপারে ভারতের দ্বিমুখী নীতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার একটা চিরাচরিত চাপ ভারতের পক্ষ থেকে অব্যাহত থাকে, আর এদিকে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরালো করতে যেন কোন বাঁধা নেই—অথচ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চীন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। দ্বিমুখী আচরনের আরেকটি উদাহরন, বাংলাদেশের নেপাল ও ভুটানের সাথে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ভারতের বাধা দেয়া। এজন্য প্রয়োজন, ভারতের নিজ ভূখণ্ডের মাত্র ৪০-৫০ কিলোমিটার জায়গা দিয়ে বিদ্যুত সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা। বাকি সব কিছু ঠিক থাকলেও ভারতের অসহযোগিতা এবং অস্বীকৃতির জন্য এই তিন দেশের কেউই একে অন্য দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি। অথচ, ভারত তার সুদূরবর্তী সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের রাস্তা, জমি ও বন্দর ব্যবহারের দাবি পূরণে সচেষ্ট  ছিল শেখ হাসিনার সরকার। বার্তাটি পরিষ্কার: ঢাকার সার্বভৌমত্ব আলোচনার বিষয়;  আর নয়া-দিল্লীর স্বার্থ থাকবে সর্বাগ্রে।

বিপন্ন সার্বভৌমত্বের আরেকটি নিদর্শনঃ সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ নিয়ে লুকোচুরি

শুধু ভারত আর চীন না, যুক্তরাষ্ট্রকেও জড়িয়ে ফেলে সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে। জাতিকে যা স্তম্ভিত করেছিল তা হলো সংসদে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার কূটনীতিবিরুদ্ধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ দখল করার গোপন সামরিক ইচ্ছার কথা উল্লেখ করা। এই কপট তথ্য কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জনমনে একটা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করার প্রয়াস ছিল  যাতে ভীতি প্রদর্শন করে একটা জরুরী অবস্থা সৃষ্টি করা যায়, অথবা জুক্তরাষ্ট্রের নাম করে অন্য কোন রাষ্ট্রের স্বার্থসিদ্ধি যা শেখ হাসিনার উপর আস্থা শুন্যের কোঠায় নামিয়ে নিয়ে আসে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এই দাবি হেসে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু যা ক্ষতি হবার তা হয়ে গিয়েছিল: বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে এভাবে গল্প বানানো সার্বভৌমত্বকে খেলো করে ফেলা ছাড়া আর কিছুই না।

এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ভুলই ছিল না—এটি ছিল জনগণের বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো, জাতি একটি অশান্ত সত্যের মুখোমুখি হয়েছিল—স্বাধীনতার রক্ষকই ভক্ষক। বিদেশি মিত্রতার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার উপক্রম একটা নতুন উদ্বেগ উন্মোচন করে বাংলাদেশীদের কাছে।

জনগণ এধরনের সার্বভৌমত্ব-সংকটে চুপ করে বসে থাকেনি। প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক ছিল। জনসমাজে যেসব প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল সেগুলো খন্ডাতে পারেনি শেখ হাসিনার লোকজন:

·  এত সংবেদনশীল আলোচনা এতদিন গোপন রাখা হয়েছিল কেন?

·  আর কোন কোন চুক্তি জনগণের অগোচরে রয়েছে?

·  বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কতটুকু ইতিমধ্যেই বিসর্জন দেওয়া হয়েছে?

স্বভাবতই, স্বাধীনতাচেতা একটি জাতি, ইতিহাস বলে, যারা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে সদা প্রস্তুত তাঁরা যদি নিজের বিপন্ন সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে শুরু করে তাঁর জন্য তাঁরা তো এর জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করবেই। এবং ২০১৪ এর পর হতে এটা স্পষ্টত যে শাসনব্যবস্থা অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে তাঁরা বিভিন্ন বিদেশি শক্তিকে খুশি করতে ব্যস্ত। কাজেই, ২০২৪ সাল নাগাদ তাঁর প্রতি জনগণের মনে ঘৃণা তীব্র হয়ে একটা জ্যন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে অগ্নুৎপাতের অপেক্ষায়, সেটা শাসনে থেকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

 জাতীয় নিরাপত্তার ব্যত্যয়

জাতীয় প্রতিরক্ষার সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানকেও রাজনীতিকরন করে তাদের কার্যপ্রণালীকে একপ্রকার লাইনচ্যুত করে দেয়া হয়। গোয়েন্দা ও সামরিক প্রোটোকল দেশের প্রতিরক্ষার বিপরীতে কাজ করতে দেখা দেয়। এরা বহিঃশত্রু নিধন না করে, বরং নিজ নাগরিকদের নিপীড়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

ভারতীয় এজেন্টরা "যৌথ প্রশিক্ষণ"-এর অজুহাতে বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্টগুলিতে অবাধে চলাফেরা করতো বলে অভিযোগ ছিল। অথচ বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী প্রধানতম একটি বহিঃশত্রু বলতে ভারতকেই গণ্য করবে এটাই স্বাভাবিক। শত্রুর গোয়েন্দা অবাধে  ক্যন্টনমেন্টে ঘুরাফিরা করার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থা। সেই সুযোগে, বাংলাদেশের সামরিক কৌশলই তাঁরা পালটে ফেলে। প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালগুলি পুনর্লিখন করে কৌশলগত হুমকি হিসবে, ভারতকে "নেকড়ের ঘাঁটি" এর পরিবর্তে, “সবুজ ভূমী” হিসেবে পরিভাষা তৈরি করা শুরু করেছিল, যাতে আমাদের সামরিক বাহিনীর রণকৌশল বলতে কোন দক্ষতা আর না থাকে।

রমণী-ফাঁদ ও ব্ল্যাকমেইল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাদের বেশি করে ভারতের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পাঠানো এক রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র কর্মকাণ্ড চালু করে শেখ হাসিনা। এসব ট্রেনিং এ নারীঘটিত কেলেঙ্কারির ফাঁদে ফেলে সেগুলো থেকে ফায়দা উঠানোর এক সুযোগ চলে আসে ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে। অভিযোগ আছে, অনেক কর্মকর্তাদের রমণী-ফাঁদ পেতে তাদেরকে বাধ্য করা হতো ভারতীয় গোয়েন্দাদের নির্দেশমতো বাংলাদেশ বিরোধী কিন্তু ভারতপন্থি কর্মযজ্ঞে যুক্ত হতে। এভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভারতের কব্জায় প্রায় চলেই যাচ্ছিল।

দুর্নীতির জগতে সেনাবাহিনীর পদার্পণ: সামরিকবাহিনীকে দেশের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ঠিকাদার হিসেবে কাজে নিয়োজিত করা একটা গভীর সড়যন্ত্রের ব্যপক বহিঃপ্রকাশ। এতে সামরিক বাহিনীর সমর দক্ষতা অবদমিত রেখে একদিকে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে তুলেছিল এবং অপরদিকে বেসামরিক কাজে নামিয়ে দুর্নীতিকে সামরিক বাহিনীর ভেতর প্রতিষ্ঠা করার একটা উপায় তৈরি করে দেয় যাতে বিতর্কিত করা যায় সামরিক বাহিনীকে

রোহিঙ্গা সংকট সার্বিকভাবে সামরিক দুর্বলতা, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা, সার্বভৌমত্বের সঙ্কটকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশীদের কাছে উন্মোচিত করে। প্রতিবেশী দেশগুলি শরণার্থীদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেও, বাংলাদেশ একাই এই বোঝা বহন করেছিল। এই সঙ্কট একদিকে সীমান্তকে অনিরাপদ করে রেখেছিল এবং অপরদিকে বাংলাদেশের একাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রনে চলে যায় এমনভাবে যে, তারাই ঠিক করছিল রোহিঙ্গারাই কোথায় থাকবে বা কোথায় থাকবে না। যখন মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে উপচে পড়ছিল, প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে: বুঝা যাচ্ছিল, সামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্র আর স্বায়ত্তশাসিত বলতেই ছিল না, এমনকি সন্দেহ ছিল যে এই নিয়ন্ত্রণ আদৌ বাংলাদেশে হাতে ছিল কিনা।

বাংলাদেশীদের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাবের পর্যালোচনা

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভারত-বিদ্বেষী হবার  একটা প্রেক্ষাপট রয়েছে আর শেখ হাসিনা বিদ্বেষকে ব্যপকভাবে উস্কে দিয়েছে।  

১৯৭১-পরবর্তী শোষণ: ভারত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা অস্ত্র-শস্ত্র এবং সম্পদ "শত্রুর মালামাল" হিসেবে আয়ত্ত করে। ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ ভুখন্ড থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কুক্ষিগত করে যা ভারতে নিয়ে যায় তা একান্তই পূর্ব পাকিস্থান, তথা বাংলাদেশের সম্পদ ছিল। একেবারে জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের এই শোষণমূলক আচরনই বলে দেয় পরবর্তী সম্পর্ক কেমন হবে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা: ২০১৫ সালের পর হতে ভারতীয় প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশকে বরাবরই "কৃতঘ্ন" হিসেবে আখ্যায়িত করাকে একটা রেওয়াজে পরিণত করে। উপরন্তু ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্র যেন বাংলাদেশীদের হেয় প্রতিপন্ন করতে একপ্রকার বিকৃত আনন্দ উপভোগ করতে দেখা যায়। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, মিঃ অমিত শাহ জনসম্মুখে উদ্ধতভাবে বাংলাদেশীদের "উইপোকা” বলে গালমন্দ করাটাকে বাংলাদেশের দুর্বল পররাষ্ট্র নীতি এবং সার্বভৌমত্বকেই একটা পরীক্ষার মধ্যে ফেলে। বাংলাদেশের গণ মাধ্যম ছাড়া রাষ্ট্র কিংবা সামরিক বাহিনী কর্তৃক কোন প্রতিবাদ কিংবা প্রতিক্রিয়া না জানানো বাংলাদেশীদের বিস্মিত করে। সবমিলিয়ে, ভারত এই জাতির যুবসমাজের বন্ধুত্ব পাওয়ার যে সামান্য সামর্থ্য ছিল তাও হারিয়েছে। এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজম্ন এর প্রতিশোধ নেবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জন্মানো ধিক্কার বিস্ফোরণঃ হাসিনার শাসনামলে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম নানান কারনে ভারত বিদ্বেষী হয়ে উঠে। বাংলাদেশকে ভারতের করত-রাজ্যে পরিণত করার দায়ে শেখ হাসিনাকে তাঁরা একপ্রকার ভারতের "নিয়োজিত শাসক" হিসেবে মূল্যায়ন করতো তাঁর প্রমাণ মেলে তাদের শ্লোগানে। বুঝাই যায় যে, শেখ হাসিনাকে এই কারনে তাঁরা অনেক আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং ঢাকার চেয়ে দিল্লীর প্রতি আওয়ামীলীগের আনুগত্য তরুণ প্রজন্মকে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তিতে পরিণত করেছে।

শেখ হাসিনার গোপন চুক্তি ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা

শেখ হাসিনার সরকার ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU)-এর তথ্য জনগণের কাছ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রেখেছিল—যেটা জাতির চোখে তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও  বিপন্ন করে তুলছিল। এই চুক্তিগুলিকে গোপন রাখার মাধ্যমে, তার সরকার কেবল গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে এড়িয়েই যায়নি, বরং একটা বিদ্রোহকে আরও উসকে দিয়েছিল।

 এই স্বচ্ছতার অভাব অবশ্যয়ই কূটনৈতিক অদক্ষতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তদুপরি, তার শাসনকে ইতিমধ্যেই অবৈধ হিসেবে দেখা হচ্ছিল দেশ বিদেশে। ফলস্বরূপ, সার্বভৌমত্ব ক্রমাগত সব দিক থেকে আঘাত পেতে পেতে বাংলাদেশিদের মধ্যে হতাশাও ক্রমাগত গভীর হচ্ছিল। শেখ হাসিনার সরকার জাতীয় স্বার্থ এবং স্বায়ত্তশাসন রক্ষায় অনিচ্ছুক বলেই তাকে শত্রু গণ্য করে ফেলে এদেশের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ কি এই সার্বভৌমত্বহীনতা মেনে নিবে? কখনই না। তাই শেখ হাসিনার পতনকেই সার্বভৌমত্বের সমার্থক হয়ে পড়ে। একটা উপলক্ষের অপেক্ষায় ছিল। সেই উপলক্ষ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণবিপ্লব।

শেখ হাসিনার ভারত গমন: বিশ্বাসঘাতকের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণ

 রাজনৈতিক পতনের পর শেখ হাসিনার ভারতে পালানো কেবল একটি প্রস্থান ছিল না—এটি ছিল প্রভুর কাছে তাঁর প্রত্যাবর্তন, যা এদেশের মানুষ অনেক আগেই সন্দেহ করেছিল। ব্যক্তিগত লাভের জন্য সার্বভৌমত্ব বেচে দিয়েছিল একপ্রকার শেখ হাসিনা বিদেশি স্বার্থের পদতলে।

এখন তো শেখ হাসিনার শাসনামল শেষ। সার্বভৌমত্বের যে ক্ষতি হয়েছে, তা জাতিকে একটি নিঃশেষ, নিষ্প্রাণ অবস্থায় নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ কি তার স্বত্বা ফিরে পাবে, নাকি ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতাময় আকাঙ্ক্ষার আবর্তে আটকে থাকবে? ২০২৪ সাল পর্যন্ত, সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো ছিল অপরিহার্য। কিন্তু গভীরতর প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়েই গেছে: ১৫ বছরে কায়দা করে দুর্বল করা সার্বভৌমত্বের ভিত্তি কি কখনও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? সেটি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি হাসিনা-উত্তর চ্যালেঞ্জ। এখন পর্যন্ত, এই "বিশ্বাসঘাতক রাস্ট্রনায়ক"-কে অপসারন করাটাই অর্ধেক যুদ্ধজয় হিসেবেই দেখছে এদেশের জনগণ। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।

post-ads

যে বাংলাদেশকে আমরা দেখেছি তা পরিবর্তন হয়ে গেছে: অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী

Apr 1, 2025 DailyJugantor Bangladesh যে বাংলাদেশকে আমরা দেখেছি তা পরিবর্তন হয়ে গেছে: অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সাক্ষাৎকারগ্রহণ: যোবায়ের আহসান জাবের এই সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় ভারত বিদ্বেষী বাংলাদেশের চিত্র একে দিয়েছেন, এই বর্ষীয়ান চিন্তাবিদ

চট্টগ্রামে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পুরো ভিডিও | AK Abdul Momen | Channel 24

Aug 19, 2022 More Hindu than Mr. Narindra Modi, Sheikh Hasina’s Foreign Minister, Mr. Abdul Momen, often appeared more zealous in his pro-India rhetoric than even Mr. Narendra Modi himself. His numerous public declarations of allegiance to India were so effusive that they risked portraying Bangladesh as little more than a client state—a perception that undermined the nation’s sovereignty and fuelled public discontent.

What does Sheikh Hasina’s landslide victory mean for India - Bangladesh relations?

Jan 6, 2019 Dr. Happymon Jacob discusses results of the recent general elections in Bangladesh with Ambassador Veena Sikri (High Commissioner to Bangladesh. Dec 2003 to Nov 2006). The conversation also looks at what these results will mean for India-Bangladesh relations. What is the current state of relations between the two countries and how this may change with increasing Chinese forays into South Asia? What can India learn from its relations with Bangladesh and apply to its policies towards other regional neighbours? This discussion follows a familiar pattern—one where Indian think tanks were systematically deployed to cultivate a favourable international narrative around Sheikh Hasina’s regime. What remains striking is the extent to which her government relied on these external actors to legitimise its rule and amplify its modest geopolitical achievements. Ultimately, Hasina’s failure to develop independent Bangladeshi think tanks speaks volumes. Like a deep-state apparatus, these foreign-backed voices effectively monopolised the discourse, ensuring no authentic domestic platform could emerge to challenge their hegemony or reframe the national conversation

ড.ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্ত, ভারতের পথ ব/ন্ধ | International News | Ekattor TV

Mar 21, 2025 This report by a mainstream news outlet details how Indian fishermen have systematically exploited Bangladeshi waters—with tacit acquiescence from Bangladesh’s administration. It serves as a stark example of the broader pattern of resource plunder that has unfolded under Sheikh Hasina’s watch, provoking outrage across all strata of society, including the nation’s military establishments.

মুখোমুখি সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

Apr 1, 2025 The cultural advisor’s intervention exposes how India’s soft power apparatus—from media saturation to linguistic imperialism—has systematically undermined Bangladesh’s post-1971 cultural sovereignty. What began as shared subcontinental heritage now manifests as asymmetric cultural pressure, straining the very foundations of Bangladeshi identity. The cultural undermining of the Bangladeshi youth has created a sharp agitation over last 15 years and created an “in group vs out group” psychological bias among them.

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৮
তথ্য বিপর্যয়

তথ্য বিপর্যয়: শেখ হাসিনার পতনের একটি প্রধান কারণ, ২০২৪

ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পর—বলতে গেলে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনা থেকেই—বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো দেখতে পায় একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের উত্থান, যা কিনা স্বৈরশাসনের মতো করে চতুরতা ও কঠোরতার সাথে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। প্রথমে যা একটি সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ বলে মনে হচ্ছিল, তা খুব দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ তথ্য অবরোধে পরিণত হয়। পূর্বের ন্যায় ভীতিকর কর্তৃত্ববাদী শাসনের ভূত যেন দেশের উপর চড়ে বসে, যা ১৯৭২-১৯৭৫ সালে শেখ হাসিনার বাবার আমল এবং ১৯৮৩-১৯৯০ সালে এইচ. এম. এরশাদের শাসনে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সেটা মনে হচ্ছিল আবারও ফিরে এসেছে, এবার আরও ভয়াবহ রূপে ।

এই পরিবর্তনের পেছনে যেন কাজ করছিল কোন এক "অশুভ-মেধা"—তথ্যবিভ্রাটের সুনিপুণ  কারিগর—যে কিনা  শেখ হাসিনার শাসনের শুরু থেকেই শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যের জন্য  একটি অব্যর্থ বয়ানযন্ত্র তৈরি করার কাজে নিয়োজিত হয়, অবশ্য যেটার রিমোট কন্ট্রোল ছিল সরাসরি হাসিনার মুঠোতেই। সাধারণ মানুষ খুব দ্রুতই সত্য-মিথ্যার একটা ধুম্রজালের মধ্যে পড়ে যায়। তাদের মনে একটি সহজ কিন্তু অশান্তিকর প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করে: "আমাদের কি নিজ দেশে বসে সত্য জানার কোন অধিকার নেই?"

পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা

অর্থনৈতিক উন্নয়নের মিথ্যা বয়ান তৈরি করতে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতির তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন বা বিকৃত হতে থাকে খোদ সরকারের হাতেই। সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যে এই প্রতারণামুলক কাজের অংশ হবে তা কেউ কখনো ভাবতে পারে নি। অর্থনৈতিক সূচকগুলোকে এমনভাবে সাজানো  হয় যাতে প্রকৃত অপ্রিয় চিত্র ঢকা পড়ে যায় এবং উন্নয়নের লেবাসআবৃত দেশের অর্থনীতির চিত্র ফুটিয়ে তুলে পুরো জাতির সামনে। তথ্যগুলো যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই এলোমেলো করে দিচ্ছিল এগুলো নিরীক্ষা করার কোন উপায় ছিল না। উপরন্তু এগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে রাষ্ট্রযন্ত্র তথ্য-বিভ্রাটের অভিযোগ এনে হেনস্থা করার আইন তৈরি করে রেখেছিল, যাতে কিছুতেই তাদের তৈরি বয়ানের বাইরে কেউ না যায়। ২০১৬ সালের পর হতে প্রায়ই এই প্রচারগুষ্ঠি বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে তুলনা করতে শুরু করে যা জনগণকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলে।

মূলত সামনে একটি সুন্দর পর্দা দিয়ে পেছনের কুৎসিত বাস্তবতাকে ঢেকে দেবার জালিয়াতির কৌশল অবলম্বন থেকেই তথ্য বিপর্যয়ের শুরুটা। সময়ের সাথে সাথে এটি জনগণের কাছে কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ধ্বংস করেনি, বরং মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিও মানুষের আস্থা নষ্ট করে দেয়। যখন রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে কিংবা গণ মাধ্যমের উপর এদেশের মানুষ আস্থা হারাতে থাকে, তখন মানুষ বিকল্প উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সত্যের সন্ধানে। তথ্য জানা থেকে মানুষকে বিরত রাখা বেশ দুরূহ। আটকানোর চেষ্টা করলে সন্দেহ বেড়ে যায় বহুগুণে।

মানসিক বিকাশে তথ্যপ্রবাহের ভুমিকা

শেখ হাসিনার শাসনামলে পাঠ্যপুস্তক থেকে সংবাদমাধ্যমে যা কিছু প্রকাশিত বা প্রচারিত হতো, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন জাগত: "আমরা যা জানি, তা কি সত্যিই জানি? এটা যাচাই করার কোনো উপায় আছে কি?" ১৫ বছরে একটি প্রজন্ম—বিশেষ করে সর্বশেষ প্রমন্ম (জেন যি)—বেড়ে উঠেছে মিথ্যা তথ্য ও অর্ধসত্যের পরিবেশে, একটি বিকৃত বাস্তবতায় যা তাদের বিভ্রান্ত, সন্দেহপ্রবণ এবং শেখ হাসিনার সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। একদিকে তাঁরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে নিরুপায় হয়ে তরুণ প্রজন্মকে বিদেশ পাড়ি দিতে হচ্ছে কিন্তু রাষ্ট্র যন্ত্র ক্রমাগত প্রচার করে যাচ্ছে যে দেশ “সিঙ্গাপুর” হয়ে “উন্নয়নের রোল মডেল”। এসব নিয়ে রাষ্ট্র যেন এক ভাড়ে পরিণত হয়েছিল এই প্রজন্মের কাছে। নিঃসন্দেহে তাদের সামাজিক আচরণেও একটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে, যা সামাজিক মনোবিজ্ঞানে অধ্যয়নের যোগ্য।

একই সময়ে, রাষ্ট্রযন্ত্র একটি কর্তৃত্ববাদী দানবে পরিণত হচ্ছিল, যেটা শেষ পর্যন্ত, ২০২২ সালের পর হতেই,  রাষ্ট্র বনাম জনগণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অভিযোগের সত্যতা কিছুতেই নিরূপণ করা যাচ্ছিল না। এতে রাষ্ট্রের দায়টাই বেশি, কারন রাষ্ট্রই জনগণকে বিভ্রান্ত করছিল এবং রাষ্ট্রের দেয়া আংশিক তথ্য জনগণকে আস্থায় নিতে পারছিল না। যেমন, ২০২৪ এর গণ বিপ্লবের সময় একজন রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে সবাই দেখছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যু সনদে গুলির উল্লেখ নাই। পৃথিবীর যে কোন সভ্য দেশ হলে এই গুলি কোন বন্দুক থেকে বের হয়েছে তাঁর তথ্য ব্যলেস্টিক প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসতেই হতো। এভাবে,রাষ্ট্র তথ্যবিভ্রাট তৈরি করার কারনে এই ক্ষোভ ছাইচাপা আগুনের মতো ধীরে ধীরে বাড়ছিল, বিস্ফোরণের দ্বারপ্রান্তে—কিন্তু শাসনযন্ত্র হয় তা লক্ষ্য করেনি, নয়তো উপেক্ষা করেছে – সেটাও ব্যপক তথ্য বিভ্রাটের কারনেই। এর খেসারত হিসেবে শাসনযন্ত্র এবং জনগণ উভয়কেই দিতে হয়েছে এক চরম মূল্য দিয়ে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে। 

মিথ্যার জাল

তথ্যের অবাধ প্রবাহকে বাধা দিতে একটি পরিকল্পিত মিথ্যার জাল তৈরি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কৃত ভয়াবহ মানবাধিকা লঙ্ঘনকে গণমাধ্যমে আসতে দিত না। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে সেখানেও সত্য প্রকাশে বাধা দিচ্ছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং সমালোচকদের দমাতে নানা গল্প তৈরি করত। চরিত্র-হনন করা এতো মামুলী ব্যপার হয়ে যাচ্ছিল যে শেখ হাসিনার নিজস্ব লোকগুলোও এই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছিল।  মূলধারার গণমাধ্যম, যা রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল, তা পরিণত হয়েছিল প্রোপাগান্ডা যন্ত্রে, প্রায়ই গোয়েন্দা সংস্থার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করতে হতো। অনেক ক্ষেত্রে মনে হচ্ছিল, রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের বদলে বিদেশী স্বার্থে কাজ করছে যা এক প্রকার তথ্য সন্ত্রাসে রূপ নেয়।

রাষ্ট্র কর্তৃক তথ্য বিকৃতি প্রায়শই সমাজে একটি গণভিত্তিক "আমরা বনাম ওরা" মানসিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক আগ্রাসনের জন্ম দেয়, যা সামাজিক মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে — বাংলাদেশের বাস্তবতায়ও তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে:

মানসিক বিভক্তি ও অবিশ্বাস: রাষ্ট্র যখন তথ্য বিকৃত করে, তখন তা নাগরিকদের মধ্যে সরকার এবং সরকারের মদদপুস্ট অভিজাত-গোষ্ঠীদের নিয়ে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এই অবিশ্বাস ক্রমে সমাজে মেরুকরণ ঘটায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তীব্র মেরুকরণ দেশকে রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে এক মারাত্মক সংঘাতের মুখোমুখি করে তোলে।

বিরোধীপক্ষকে কব্জা করে ফেলা: রাষ্ট্রের বয়ান প্রায়ই ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদের জাতির শত্রু, দেশদ্রোহী বা বিদেশি এজেন্ট, সন্ত্রাসী, দুশ্চরিত্র হিসেবে চিত্রায়িত করে। এর মাধ্যমে তথাকথিত "অপর পক্ষের" বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক আগ্রাসন বৈধতা দিতে থাকলে মেরুকরন চিরস্থায়ী হয়ে পড়ে।

দমন থেকেই তথ্য-বিকৃতি জন্মানো: তথ্য-বিকৃতি বিরোধীকণ্ঠকে গোষ্ঠীগুলোকে দমনের কাজেই বেশি ব্যবহার করে ফ্যশিস্টরা। এতে সামাজিক মনোবিজ্ঞানে "আমরা বনাম ওরা" দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করে তোলে।

ঐতিহাসিক উদাহরন: ইতিহাসে নাৎসি জার্মানি হোক কিংবা উত্তর কোরিয়া বা বাংলাদেশ - সকল স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাগুলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিকৃতির মাধ্যমে জনগণকে বিভক্ত করার এবং একাংশকে "আভ্যন্তরীণ শত্রু" আখ্যা দিয়ে সহিংসতা বৈধ করার প্রবণতা দেখা যায়।

কিছু বিদেশি শক্তি সত্যিই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশের অভ্যন্তর থেকেই ছড়ানো মিথ্যাচার সেই বিভাজনকে আরও বেশি গভীর করে তুলেছিল। রাষ্ট্রের বয়ান বাস্তবতা থেকে যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল, প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা ততোই ভেঙে পড়ছিল।

হাসিনার শাসনের প্রাথমিক বছরগুলো হত্যা, গুম, নজরদারি ও হুমকির ভয়াবহ কাহিনী দ্বারা কলুষিত ছিল — যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটিই: তথ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ। এটি এক ধরনের দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছিল: মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর তৈরি করা হত বানানো বয়ান। এবং সত্য প্রচারের উপর কড়া বিধিনিষেধ মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হতো ন্যক্কারজনকভাবে। 

উদাহরণের অভাব নেই
২০১৪ সালে, শেখ হাসিনা যেভাবে দেখিয়েছিলেন, যে কূটনীতিক পাড়ায় অবস্থিত খালেদা জিয়ার বাসভবন ঘিরে ফেলা বালিবোঝাই ট্রাকগুলো "হঠাৎ করেই" হাওয়া থেকেই উদয় হয়; ২০১৩ সালে, হেফাজত-ই-ইসলামের উপর কঠোর অভিযানের সময় কেউ মারা যায়নি; জোরপূর্বক গুমের অস্তিত্বই ছিল না; আর বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা "স্বাধীন ও নিরপেক্ষ" বিচারব্যবস্থার প্রতিফলন হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছিল। এসব বক্তব্য এতটাই হাস্যকর ছিল যে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রাষ্ট্রীয় তদন্তের অবিশ্বাস্যতাকেও টপকে গিয়েছিল। ২০২৪ সাল নাগাদ, এসব ঘটনায় শেখ হাসিনার সরকারের উপর জনসাধারণের আস্থা ও শ্রদ্ধা ব্যাপকভাবে কমে যায়, কারণ সোশ্যাল-মিডিয়া-ব্যক্তিত্বরা রাষ্ট্রীয় বয়ানকে ক্রমাগত ভুল প্রমাণ করতে থাকলে তাদের দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী তাদের অনুসারী বনতে থাকে।

জাতিকে সবচেয়ে বেশি হতবাক করেছিল যখন শেখ হাসিনা দেশের সুশীল সমাজের মেধাকে সম্পূর্ণ হেয় প্রতিপন্য করতে শুরু করে এসব মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে। সাধারণ মানুষ তাঁর বাবার শাসন আমলের ইতিহাসকে কিভাবে মূল্যায়িত করে তা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। মানুষের চিন্তাশক্তিকে অবজ্ঞা করার দুঃসাহস কেমন করে দেখায় শুধু ক্ষমতার জোরে তা সত্যি অবার করার মতোই। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তার বাবার স্বৈরশাসন থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে, তিনি এর সবচেয়ে অন্ধকার দিকগুলোই পুনরাবৃত্তি করেছিলেন:

 সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ

জোর করে চাপিয়ে দেয়া সংবাদ পরিবেশন যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র বিশ্বাসযোগ্য হয়

রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন দলকে মহিমান্বিত করতে উপাখ্যান প্রচার  

ভিন্নমত পোষণকারী হয়রানি এবং সেই সংবাদ পরিবেশনকারীদের নির্যাতন

ফোন ট্যাপিং সহ গণ নজরদারি

ভিন্নমতকে অপরাধীকরণ

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা

সুশীল সমাজ ও এনজিওগুলোর উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকর করে ফেলা

অনলাইন নজরদারি ও সাধারণ মানুষের উপর মাত্রাতিরিক্ত গোয়েন্দাগিরি

দমনমূলক আইন তৈরি করে দলীয় স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দেওয়া

দমনমূলক আইনের অপব্যবহার করে দলীয় লোকজনদের নিরব ডাকাতি আর চাঁদাবাজির সুযোগ সৃষ্টি

২০১০-এর দশক থেকে বিশ্বে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উত্থানের সাথে সাথে বাংলাদেশের মানুষ সত্য খুঁজতে এদের উপর নির্ভর হয়ে পড়ে—কারন এগুলো মানুষের হাতের মুঠায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের নাগালের বাইরে। যেহেতু ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি মাধ্যম সরকারের প্রচারযন্ত্রকে অকার্যকর করে ফেলছিল, তাই তারা কর্তৃত্ববাদী সরকারের ন্যয় ডিজিটাল মাধ্যমকে তাদের প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। গোয়েন্দা সংস্থার তীব্র হুমকি সত্ত্বেও, নাগরিকরা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত তথ্য-শূন্যতা পূরণ করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকেই ঝুঁকছিল। ২০১৬ সাল নাগাদ জনগণের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে সেন্সরশিপের একটাই মূল উদ্দেশ্য: মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে হলেও ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত, বিদেশীদের রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড—যেগুলোকে ইসলামী জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে হোলি আর্টিজান হামলাও রয়েছে—রাষ্ট্রের ব্যাপক জঙ্গি-বিরোধী অভিযানের অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। আশ্চর্যের বিষয়, কয়েকজন মূল দুষ্কৃতিকারীকে হাতেনাতে ধরে ফেলা সত্যেও, মূল সন্দেহভাজনদের বিচারের বদলে গোপনে হত্যা করে ফেলা হতো, যাতে কোন সবুত না থাকে এবং গল্পটিকে যেভাবে খুশী সেভাবে সাজানো যায়। কিছুদিনের মধ্যেই এসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা খুব দ্রুত মূল ধারার গণমাধ্যম থেকে হারিয়ে গেলেও জনমনের প্রশ্ন হারায় না।

বাংলাদেশে, যে মেধাবী সাংবাদিক ছিল না তা না। কিন্তু শেখ হাসিনার কোন সমালোচনামূলক সাক্ষাৎকার গ্রহণ বা প্রচার একেবারেই অসম্ভব ছিল বাংলাদেশের মাটিতে। এভাবে জবাবদিহিতাকে বলি দেওয়া হয়েছিল সেন্সরশিপের বেদীতে। যেসব সাংবাদিকদের দ্বারা তিনি বাংলাদশে পরিবেস্টিত ছিলেন সেটা ছিল তার নিজেরই তৈরি করা প্রচারযন্ত্র। ২০১৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে অন্যান্য স্বৈরশাসকদের কাতারে ফেলতে থাকে। তিনি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে, বিশ্বের বাকি অংশে যে মতামত গড়ে উঠছিল তা তার জন্য উদ্বেগজনক ছিল—তাদের প্রশ্নগুলোকে চাতুর্যের সাথে এড়াক কিংবা সরাসরি মোকাবেলা করুক।

এটি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে। রাষ্ট্রযন্ত্র নিজের দেশকে বিশ্ব-দরবারে "ইসলামী-জঙ্গি-রাষ্ট্র" হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এতো মরিয়া কেন? ন্যায়বিচার কি কখনো লক্ষ্য ছিল? নাকি এই নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছিল? সংবাদমাধ্যমকে তাহলে এতো নিয়ন্ত্রণ কেন? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের অবৈধ প্রমাণ করতে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সন্ত্রাসী হিসেবে সাজানোর জন্য?

বাংলাদেশ একটি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ। একটি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশেই ইসলামবিদ্বেষী উপাখ্যানকে  হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তরুণ মুসলিমদের প্রোফাইলিং করে গ্রেফতার, এমনকি তথাকথিত "এনকাউন্টারে" হত্যা করা হয়েছে—প্রায়শই বুলি-নির্ভর প্রতিবেদন সাজিয়ে, কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই। পুলিশ বিজ্ঞাপণ-ধর্মী  ভিডিও, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে এই উপাখ্যানকে জোরদার করেছে যে দেশে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি হচ্ছে। কিন্তু এই কৌশল উল্টো তাদেরকেই বিপদে ফেলেছে—জনগণ এটাকে ব্যাপকতর একটি ইসলাম-বিরোধী, রাষ্ট্র-বিরোধী ও শান্তি-বিরোধী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যারা ছিল এর ক্রমাগত টার্গেট।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কখনোই ধর্মীয় উগ্রবাদের উর্বর ভূমি ছিল না। কিন্তু বিদেশী কিছু ইসলাম বিদ্বেষী রাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সরকার এমন একটি দানব-রাষ্ট্র তৈরি করেছে। বাস্তবে, সরকার প্রকাশ্যে বাংলাদেশে ISIS-এর উপস্থিতি অস্বীকার করলেও, একই সাথে এই উপস্থিতি দেখাতে তারা নানা ঘটনা তৈরি করতে থাকে। এই অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান জনগণকে মিথ্যে বিশ্বাস করাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মতো দমনমূলক আইন, সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে এর বিপরীত দাবি ও পাল্টা বয়ানের ঢেউ রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও অবনত করেছে। একই ব্যক্তিদের বারবার "অভিযানে" গ্রেফতার, আজগুবি সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এবং বারবার "পূর্ব নির্ধারিত" প্রেস ব্রিফিং জনগণের অবিশ্বাসকে গভীর করেছে।

২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের যুবসমাজ বুঝে যায় যে, এই কাউন্টার-টেররিজম উপাখ্যানগুলো বহির্বিশ্বের মিত্রদের খুশি করতে এবং  সমর্থন আদায়ে আদায়ের জন্য নাটকীয় প্রদর্শনী মাত্র। কিন্তু এর মূল্য দিতে হয়েছে রক্ত দিয়ে—প্রায়ই নিরীহ নাগরিকদের যেটা যতোই মিথ্যা প্রতীয়মান হচ্ছে তাদের কাছে ততোই তাঁরা পাল্টা ক্ষোভে ফেটে পড়ছিল। জুলাই ২০২৪-এ, যখন বিক্ষোভ তীব্র হয়, হাসিনা-সরকার তাঁর নাট্যবাহিনী নিয়ে বিক্ষোভকারীদের আবারও ফাঁসানোর গল্প তৈরির চেষ্টা করে—মেট্রোরেল ও সরকারি অফিস অগ্নিসংযোগ ও  ভাঙচুরের অভিযোগ আনে। কিন্তু এবার জনগণকে এসব নাটকে টলানোতো যায়ই-নি উপরন্তু আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়, এবং নিরাপত্তা বাহিনী অন্ধকারের আড়ালে আরও নৃশংসতা চালায়। বিড়ম্বনা হলো, এই ইন্টারনেট বন্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছিল তার নিজের সমর্থক ও অভিজাত-গোষ্ঠী।

যখন শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন—এমনকি তার দেশীয় মিত্রদের কাছেও তার প্রস্থান গোপন রাখা হয়—তখন প্রচারণাযন্ত্রের পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে। সত্য তথ্যের প্রবাহ পুনরুদ্ধার হয়। তিক্ত হলেও প্রকৃত তথ্য নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সামাজিক বন্ধনকে স্বাভাবিক করতে শুরু করে। তার শাসনকে টিকিয়ে রাখা উপাখ্যানগুলো রাতারাতি বাজার থেকেও উধাও হয়ে যায়।

এখানেই "তথ্য বিপর্যয়" শব্দটির সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রয়োগ ঘটে। শাসনব্যবস্থা এতো জটিল প্রকৃতির মিথ্যা তথ্যের স্তর তৈরি করেছিল যে তারা নিজেরাই তাতে হারিয়ে যায়। এই বিভ্রম ধরে রাখতে তারা মিডিয়া, গোয়েন্দা সংস্থা ও শিক্ষাঙ্গনে শতাধিক গোয়েবলস-সদৃশ প্রচারক সৃষ্টি করে। সময়ের সাথে সাথে এই এজেন্টরা হাসিনাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, তিনি তার নিজের তৈরি যন্ত্রেরই বলীতে পরিণত হন—প্রথমে রাষ্ট্রের নেতা হয়ে, পরে অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করে তাঁর মধ্যেই হারিয়ে  নিজেই  গভীর রাষ্ট্রযন্ত্রের পুতুল পরিনতি একটা সাধারণ চিত্র বাংলাদেশে মতো রাষ্ট্রেগুলোর যেখানে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো এখনো মজবুত হতে পারেনি। তবে তিনি "তুমিও, ব্রুটাস?" বলার অবস্থায় পৌঁছাননি। তাঁর আগেই উনি পালিয়ে যান।

শেষ পর্যন্ত তার পতন কেবল দুর্নীতি, দমন-পীড়ন বা অর্থনৈতিক অদক্ষতার কারণেই ঘটেনি। এটি ছিল প্রকৃত তথ্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা—বাস্তবতাকে পদ্ধতিগতভাবে "উপাখ্যান" দিয়ে প্রতিস্থাপন। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ডঃ এরিক এরিকসনের "সাইকোসোসিয়াল ডেভেলপমেন্টের আটটি স্তর" অনুযায়ী, ১২-১৮ বছর বয়সী তরুণদের "আত্মপরিচয় বনাম নিজভূমিকা বিভ্রান্তি" সংকটের মুখোমুখি হয়। কল্পনা করুন, ৫-১৬ বছর বয়সী একটি শিশু যদি "তথ্য বিপর্যয়" এর যুগে বড় হয়, ২০২০ সালে তার মানসিক বিকাশ কেমন হবে?

স্কুলের বইয়ে ক্ষমতাসীন দলের গৌরবগাথার নজিরবিহীন এবং ব্যপক প্রচারণা সত্ত্বেও—তাদের হতাশা, ক্ষোভ ও আশেপাশের ঘটনাবলী নিয়ে অসন্তোষ শাসনব্যবস্থাকে তাদের সামাজিক জ্ঞানগত বিকাশ ও ভূমিকা সংকটে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতার মধ্যে (যেমন: শক্তিশালী পরিচয় বা জীবনের দিকনির্দেশনা নিয়ে দ্বিধা), এই বয়সী তরুণরা যেকোনো পরিচয় বেছে নিতে পারে এবং "আমরা বনাম তারা" মনোবিজ্ঞান দিয়ে শেখ হাসিনা শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। তারা এতটাই অপরিণত যে এই সিদ্ধান্ত তাদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে—এটি বোঝার মতো স্ফটিকীকৃত বুদ্ধিমত্তা তাদের থাকে না। তাদের প্রবাহমান বুদ্ধিমত্তা পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে প্রবাহমান হতে থাকে। 

জনগণের আস্থা যখন ভেঙে পড়ে, পরম দাপুটে শাসনও ধুলোয় মিশে যায়। আবাবিল পাখির মতো দুর্জয় হাতির পালকে পরাস্থ করে ফেলে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটল। মূলত, "ইন-গ্রুপ বনাম আউট-গ্রুপ" সিনড্রোম জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছে—যার মূলে রয়েছে তথ্য বিপর্যয়।

post-ads

যেভাবে সাজানো হয় জঙ্গি নাটক! | সার্চলাইট |পর্ব-২৯৪|২৯ নভেম্বর ২০২৪| Search Light

Hundreds Rally in Bangladesh over Writer’s Death in Prison

Mar 2, 2021. Hundreds of people protested for the fourth day against the death of a writer inside a high-security prison in Bangladesh. The case has garnered international concern. On Monday, people gathered near the Home Ministry in the capital Dhaka, calling for an investigation and made other demands. Al Jazeera's Tanvir Chowdhury reports from Dhaka. The death of Mr Mostaque—a scholarly critic of Sheikh Hasina while in police custody—sent a powerful message to the nation: dissent would not be tolerated and would be met with brutality. To the international community, as reflected in global media coverage, it signalled the onset of an information catastrophe in this small corner of the world. This tragic incident sparked a wave of protests across the globe, culminating in the widespread perception that Sheikh Hasina had become a dangerous blend of fascist ruler and desperate autocrat.

Hundreds Rally in Bangladesh over Writer’s Death in Prison

Mar 2, 2021. Hundreds of people protested for the fourth day against the death of a writer inside a high-security prison in Bangladesh. The case has garnered international concern. On Monday, people gathered near the Home Ministry in the capital Dhaka, calling for an investigation and made other demands. Al Jazeera's Tanvir Chowdhury reports from Dhaka. The death of Mr Mostaque—a scholarly critic of Sheikh Hasina while in police custody—sent a powerful message to the nation: dissent would not be tolerated and would be met with brutality. To the international community, as reflected in global media coverage, it signalled the onset of an information catastrophe in this small corner of the world. This tragic incident sparked a wave of protests across the globe, culminating in the widespread perception that Sheikh Hasina had become a dangerous blend of fascist ruler and desperate autocrat.

জঙ্গি নাটকে বন্দি খুবির ২ শিক্ষার্থী, ঈদে পাশে চায় সহপাঠীরা

This report on camera trial of two students of Khulna University says that how widespread was the terrorist tagging spree in Bangladesh by the regime. The state machinery needed to concoct a lot of misgiving on the countrymen questions why spending government money in falsification? Is this the job of a government?

The Daily Kalbela

Terrorism in Bangladesh: Political Manipulation, Ideological Roots, and Western Influence

This article entails how the Executive Branch and Judiciary grouped together to establish Bangladesh as an emerging Islamic Terrorist country. Such self-inflicting efforts, a sheer waste of national resources, were perceived as a deep wound in the reputation of Bangladesh to the rest of the world. Certainly, anger and frustrations propelled from such activities of the state machinery.

The Diplomat

জঙ্গিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মির্জা ফখরুল: তথ্যমন্ত্রী

On the surface, this appears as mere reportage, but it exemplifies how entrenched narratives are weaponised to discredit opposition political party—a strategy predating the subject’s rise to power. The media’s failure to interrogate these claims, however, represents a dereliction of its democratic duty: journalism should challenge power, not amplify its unchecked assertions. State affairs are no joke or child’s play

জাগোনিউজ২৪.কম

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৭
ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি

ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি: শেখ হাসিনাকে পতনের দিকে ঠেলে দেবার একটি মুখ্য কারন
আপনি যদি ভিনদেশী হন, তাহলে এই ব্যাখ্যা আপনাকে অবাক করতে পারে। ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে বাহবা কুড়িয়েছে—"উদীয়মান বাঘ", "উন্নয়নের রোল মডেল", "অর্থনীতির অলৌকিক নিদর্শন" ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত হয়েছে। কিন্তু এই চকচকে পর্দার অন্তরালে সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ এবং নির্মম, একেবারে দিনকে দিন অসহ্য হয়ে উঠছিল।


এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গল্প তৈরি হয়েছিল সরকারী অফিসে বানানো পরিসংখ্যানের আজগুবি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে। এগুলো দেশে এক তথ্য বিপর্যয় ঘটিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যুরো দ্বারা প্রচারিত মিথ্যা পরিসংখ্যানের জালে পেশাদার অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবে সেটা রীতিমত তাদের জন্য এক ধাঁধা বনে গেলো। কারন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, নীরব দুর্ভিক্ষ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে ব্যাপক বঞ্চনা, টাকার দ্রুত অবমূল্যায়ন এবং মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের স্রোত শুকিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে, ধনী এলিট গোষ্ঠী ফুলেফেঁপে উঠছিল, আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী টুকরো টুকরো হয়ে নিম্নবিত্ত আর ভিক্ষুকে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল। ফলাফল: মধ্যবিত্তের সংকোচন এবং এক নতুন অতিধনিক শ্রেণীর উত্থান।


সমৃদ্ধির রূপকথা 
বাংলাদেশ সরকারের সৃষ্টি করা পরিসংখ্যানের ধুম্রজাল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এক সমৃদ্ধির রূপকথা রচনা করতে থাকে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো সেই ধুম্রজালে বাংলাদেশের এক রুপালী চিত্র তুলে ধরতো এবং সেইসব আজগুবি পরিসংখ্যান দিয়ে এমন উপাখ্যান তৈরি করতো যার মাধ্যমে বিশ্বদরবার জানতোই না কি হচ্ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে।    উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি নিবন্ধে বাংলাদেশকে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পথে থাকা একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল:
"বাংলাদেশ ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘের তালিকায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রয়েছে, কিন্তু বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী এটি ২০২৪ সালের মধ্যে এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে... একটি দেশ যত বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে, তার জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সম্ভাবনা তত বেশি।"


একই ধরনের কথাবার্তা বিশ্বব্যাংক ও এশিয় উন্নয়ন ব্যঙ্কের প্রতিবেদনেও দেখা গিয়েছিল। এরকম ভ্রান্তি বিলাস চলতে থাকলে কথা ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল ঘরনার দেশে পরিণত হবে। কিন্তু ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যখন আইএমএফের কাছে আর্থিক সহায়তা চাইল, তখন এই আলোচনার সুর বদলে গেল। বিশ্বব্যাংকেরই দুটি বিপরীতধর্মী প্রতিবেদন দেখুন:


ক) "বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থিতিস্থাপকতা দেখাচ্ছে" (১৩ এপ্রিল ২০২২): 
ওয়েব লিঙ্কঃ https://www.worldbank.org/en/news/press-release/2022/04/13/bangladesh-economy-shows-resilience-amid-global-uncertainty


খ) "বাংলাদেশে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জোরালো সংস্কার অপরিহার্য" (৩ অক্টোবর ২০২৩)
ওয়েব লিঙ্কঃhttps://www.worldbank.org/en/news/feature/2023/10/05/structural-reforms-are-essential-to-sustain-growth-poverty-reduction-in-bangladesh

দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি স্বীকার করে নেয় যে, চকচকে প্রলেপের নিচে ফাটল দেখা দিয়েছে।


এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) মিশ্র সংকেত দিয়েছে। তারা ২০১৬-২০২০ অর্থবছরে "অসাধারণ অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা" তুলে ধরলেও, তাদের মূল্যস্ফীতির তথ্য অন্য গল্প বলে: ২০১৪-২০২৪ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.৪%, যা এশিয়ার গড় ৪.১৫%-এর চেয়ে অনেক বেশি। অর্থাৎ পুরো সময়টাজুড়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এই অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল যা উন্নয়নের উপাখ্যানের মুখে চুন কালি মেখে দেবার মতো ব্যপার। আর এসব তথ্য বাংলাদেশ সরকারের বানানো পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যার কোন মাথামুণ্ডু বলতে কিছু ছিল না। আদতে মুদ্রাস্ফীতি ছিল এরচেয়ে ঢের বেশি যা প্রমাণ করা দুরূহ। এভাবে উন্নয়নশীল দেশ হয়ে দেখিয়ে দেবার প্রয়াসে মিথ্যার জাল বুনে এক তথ্য-বিধ্বস্ত দেশে পরিণত হয় বাংলাদেশ। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ যে অনেক বৈশ্বিক ছাড় থেকে  বঞ্চিত করবে সেটাও এক আজব সমস্যার আবর্তে ফেলে দেয় শেখ হাসিনার লোকজনদের। তাই ২০২৬ এর পর পরিস্থিতি কেমন করে সামাল দিবে তা ব্যপক আভ্যন্তরীণ দুশ্চিন্তার জন্ম দেয়। 


জালিয়াতি করা তথ্য আইএমএফের কল্যাণে উদ্ঘাটন


এই কাগুজে অর্থনৈতিক উত্থান সম্ভব হয়েছিল ফরমায়েশি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে, বিশেষত জিডিপি ও জনসংখ্যার তথ্যে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১১ সালে জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯০ লক্ষ এবং ২০২২ সালে ষোল কোটি  ৫০ লক্ষ, বলে দাবি করেছিল—যা পর্যবেক্ষকদের মতে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে দুই থেকে আড়াই কোটি কম। ফলস্বরূপ, মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধির হার কৃত্রিমভাবে বেশি দেখানো হতো প্রতি বছর। 


২০২৩ সালে আইএমএফ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তথ্য পরীক্ষা শুরু করলে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২২-২০২৪ সালের মধ্যে ৪৫ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে ১৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায় মাত্র দুই বছরে। জনগণ এবং অর্থনৈতির সরিকগণ হতবাক হয়ে যায়। শেখ হাসিনার সরকার নতুন বৈদেশিক ঋণের সন্ধানে মরিয়া হয়ে উঠে। এভাবে তাঁর উন্নয়নের রূপকথা ফাঁস হয়ে গেলে নিজেদের তৈরি মিথ্যার ফাঁদে আটকে যায়।


এমনকি দেশীয় অর্থনীতিবিদরাও সরকারের বিভ্রান্তিকর তথ্যের জালে জড়িয়ে অর্থনীতির কোন কুল কিনারা করতে পারছিলেন না। কিন্তু অতি সাধারণ যুক্তি বলে, একটি দেশ যদি সত্যিকারের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, তাহলে তার আইএমএফের দরজায় কড়া নাড়ার প্রয়োজন হবে কেন? ২০২৩ সাল নাগাদ অর্থনীতি একদম স্থবির হয়ে পড়ে। এমন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় নি যে এমন ধ্বস নামবে। জ্বালানী তেলের দাম এক লাফে ৬০%-৬৫% বাড়িয়ে দিলো সরকার। সরকারি তথ্যে মূল্যস্ফীতি ৯% বলা হলেও বাস্তবে এটি ৩০%-এর কাছাকাছি ছিল—যা দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।


ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক ঘটনাকে দায়ী করা হলেও, ২০২৩ সালের শুরুতে তেলের দাম কমতে শুরু করে। কিন্তু তাতেও কোনো স্বস্তি আসেনি, কারণ টাকা ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪০% অবমূল্যায়িত হয়। বাংলাদেশ অতীতেও তেলের উচ্চমূল্য সামলে উঠেছিল আইএমএফের সাহায্য ছাড়াই, কিন্তু এবারের সংকট প্রমাণ করেছিল যে সমস্যাটা শুধু অর্থনৈতিক না আরও গভীরে। ব্যপক টাকা পাচার ছাড়া আর কোন কারন পাওয়া গেলো না। 


বৈশ্বিক সূচকগুলো যে সত্য বলে
মূল্যস্ফীতির বাইরেও, বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান একটি ধ্বংসাত্মক চিত্র তুলে ধরে:


•    মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই): ১৪৬তম (২০০৯) → ১২৯তম (২০২২)
•    বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সূচক (জিসিআই): ১০৬তম (২০০৯) → ১০৫তম (২০১৯)
•    ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ: ১১৯তম (২০০৯) → ১৬৮তম (২০২০)
•    দুর্নীতি ধারনা সূচক (সিপিআই): ১৩৯তম (২০০৯) → ১৪৭তম (২০২৩)
•    পরিবেশবান্ধব সক্ষমতা সূচক (ইপিআই): ১৩৯তম (২০১০) → ১৭৭তম (২০২২)
•    বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক (জিআইআই): ১১৬তম (২০০৯) → ১০৯তম (২০২৩)
•    সরবরাহ-ব্যবস্থা দক্ষতা সূচক (এলপিআই): ৭৯তম (২০১০) → ১০০তম (২০১৮)

এই সংখ্যাগুলো একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে: তথাকথিত "অলৌকিক অর্থনীতি" আসলে ধার করা সময়ে চলছিল।

সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হল ধনী-গরীবের উচ্চ ব্যবধানের আবির্ভাব। আয়ের অসমতা পরিমাপকারী মোট জাতীয় আয় সহগ মাত্রা ২০০০ সালের ০.৩৩ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ০.৪৯৯ এসে দাঁড়ায়। জনসংখ্যার শীর্ষ ৫%  জনগোষ্ঠী, জাতীয় সম্পদের ৩০%-এর বেশি নিয়ন্ত্রণ করতো, যার মধ্যে শীর্ষ ১% জনগোষ্ঠী প্রায় ১৭% সম্পদের মালিক ছিল। অন্যদিকে, নিচের ৫০% জনগোষ্ঠীর হাতে ছিল মাত্র ১০%-এর কম সম্পদ।


ধ্বসে পড়া মধ্যবিত্ত ও উদীয়মান অভিজাত-তন্ত্রের রাজত্ব


কোভিড-১৯ মহামারি প্রকাশ করে দেয় মধ্যবিত্ত শ্রেণী কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছিল। অনেকেই দারিদ্র্যের দিকে পিছলে গিয়েছিল, আর সম্পদ কুক্ষিগত হয়েছিল রাজনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে যুক্ত একদল অভিজাত গোত্রের হাতে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ নিচের দিকে নামতে থাকে, আর একই সাথে সমাজে একদল কর্পোরেট শাসকের উত্থান হতে থাকে।

এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। অর্থনীতি ধ্বংসের কারণেগুলো এরকম:
•    শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য
•    শিক্ষা ও সুযোগের অসম প্রবেশাধিকার
•    পুঁজিবাদ ও অভিজাত-তন্ত্র 
•    আর্থিক ঋণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা থেকে বঞ্চনা
•    সুবিধাবঞ্চিতদের ফাঁদে ফেলে হতদরিদ্র বানিয়ে ফেলা
•    শ্রমিক বঞ্চনা 
•    অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা
•    পরিমাপযোগ্য বাবস্থাপনার বদলে গল্প তৈরি করার সংস্কৃতি

সত্যবাদী ও দমননীতি

সরকার গণমাধ্যম ও জনমত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও, প্রবাসী বাংলাদেশী ও অর্থনীতিবিদরা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথা প্রকাশ করতে থাকেন।

ড. ফাহমিদা খাতুন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারে লিখেছিলেন:

"জাতীয় বাজেট ও অর্থনীতির আকার বাড়লেও সামাজিক খাতে বরাদ্দ খুবই কম এবং স্থবির... সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর (এসএসএনপি) প্রকৃত ব্যয় জিডিপির মাত্র ১.৩২%।"

(সিপিডি লিঙ্ক: https://cpd.org.bd/bangladeshs-growth-story-lacks-justice-and-humanity/)

বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮.৬ বিলিয়ন ডলারের তথ্য সংশোধন করতে বাধ্য হলে আরেকটি লজ্জাজনক ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নিষিদ্ধ করা দেন গভর্নর। কিন্তু তারা আইএমএফকে তাদের প্রতিবেদনে সত্য প্রকাশ করতে বাধা দিতে পারেনি:

(আইএমএফ লিঙ্ক: https://www.imf.org/en/Publications/CR/Issues/2024/06/24/Bangladesh-Second-Reviews-Under-the-Extended-Credit-Facility-Arrangement-and-the-550944)

উপসংহার: লোভে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি শাসন

শেখ হাসিনার পতন অনিবার্য ছিল। এই "অর্থনৈতিক অলৌকিক ঘটনা" ছিল জালিয়াতি করা তথ্য, পুঁজিপতি ও দমন-পীড়নের উপর দাঁড়ানো এক তাসের ঘর। কিন্তু চকচকে শিরোনাম ও কারচুপি করা পরিসংখ্যানের আড়ালে ছিল এক করুণ বাস্তবতা: ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, ধ্বসে পড়া মুদ্রা এবং নীরব দুর্ভিক্ষ জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। আইএমএফ যখন একে একে মিথ্যাগুলো উন্মোচন করল এবং মূল্যস্ফীত ঘরোয়া বাজেটকে চাপে ফেলল, তখন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের জনরোষ শুধু চাকরির কোটা নিয়ে ছিল না—এটি ছিল ১৫ বছরের অর্থনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে এক গণজাগরণ, যেখানে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং তরুণরা ছিল এই আন্দোলনের অগ্রভাগে। শেষমেশ, কোনো প্রচারই এই সত্য ঢাকতে পারেনি: বাংলাদেশের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছিল না—এটি লুটপাট হচ্ছিল।

 

post-ads

This video illustrates how the banking facilities were confined to only a small part of the people of Bangladesh who are called Oligarchs of Sheikh Hasina

সম্পদ ছাড়াই টাকা ছাপিয়েছিল হাসিনা সরকার, The Business Standard

Nov 10, 2024 গেল ২০২৩ এবং ২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক বিপুল পরিমাণ নতুন টাকা ছাপায়। দুর্বল ব্যাংক-বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলায় ওই টাকা ছাপানো হয়। ফলে দেশের রিজার্ভ মানি বাড়ে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এতে মূল্যস্ফীতিতে কী প্রভাব পড়ে? কেমন করে দুর্নীতি এবং অভিজাত-তন্ত্র এদেশের সম্পদ লুট করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল শেখ হাসিনার সরকার তাঁর একটা সামান্য তথ্য পাওয়া যাবে। পৃথিবীর কোন প্রজাতন্ত্র পাওয়া যাবে না যেখানে এরকম ঘটনা ঘটা সম্ভব। এর প্রভাব ছিল অর্থনীতিতে, বেকারত্বে, টেকসই উন্নয়নে। একই সাথে রাষ্ট্রের জনগণকে নিপীড়ন এবং তথ্য সন্ত্রাসের পেছনের কারন মূলত লুটপাটতন্ত্রকে নির্বিঘ্ন করা।

শ্বেতপত্র: ২৮ উপায়ে দুর্নীতি, ১৫ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার

বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে দেশে গত পনের বছরে ‘চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র’ তৈরি হয়েছিলো, যাতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে। এই রিপোর্টে মূলত দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে অর্থনীতির করুন চিত্র ফুটে উঠেছে। বুঝা যায়, দুর্নীতি এবং অর্থনীতির ধ্বংসযজ্ঞ একই সুত্রে গাঁথা। মূলত দশটি কারনের প্রায় অধিকাংশই এই রিপোর্টে পাওয়া যাবে। তাই এটি একটি মূল্যবান উপাত্ত এই আলোচনায়।

বিবিসি বাংলা

Bangladesh’s growth story lacks justice and humanity

As oligarchs consolidate power in Bangladesh, this incisive analysis by a prominent Bangladeshi economist and researcher lays bare the grim reality of the economy for ordinary citizens—a reality obscured by the systematic manipulation of data by government agencies. Identifying the core threats to the nation’s sustainable economic growth demands not only intellectual rigour but also considerable courage. Critical pieces of the puzzle remain conspicuously absent, deliberately omitted by authorities to distort the true state of affairs. For patriotic economists committed to transparency, the painstaking work of uncovering these missing elements—and speaking truth to power—remains an unenviable yet vital task.

The Daily Star

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৬
শাসন করার বৈধতা

শেখ হাসিনা সরকারের বৈধতার সংকট

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই শেখ হাসিনার সরকার জনগণের চোখে তার নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বৈধতা হারায়। যদিও তার দল সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল কিন্তু সিংহাসনে আরহনের ২ বছরের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এক রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু  নির্বাচন নিশ্চিত করার একটি সাংবিধানিক কার্যকর বাবস্থা বলবৎ ছিল ১৯৯০ সাল থেকে। এই প্রয়াস তাঁর ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার একটি ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে জনগণ দেখছিল। মূলত এখান থেকেই একনায়কতন্ত্রের দিকে রূপান্তরের সূচনা করেছিল বাংলাদেশকে। ফলে শেখ হাসিনার সরকারের জনসমর্থন যাচাইয়ের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, শাসন ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং দেশ ও জনগণের টেকসই উন্নয়নে তার সাফল্য যাচাইয়ের মাধ্যমে।

২০২৪ সালের মধ্যে তাঁর বৈধতা চরম সংকটে পৌঁছায়। সরকারী চাকরিতে কোটা বিন্যাসের স্বচ্ছতার দাবী থেকে সৃষ্টি হওয়া  জুলাই-আগস্টের বিদ্রোহ যদি তাকে ক্ষমতাচ্যুত না করত, তবে বাংলাদেশ মিয়ানমার বা সিরিয়ার মতো অরাজকতায় নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত। এই সরকারের আত্মঘাতী ত্রুটিটি কেবল তার নিষ্ঠুরতা নয়, বরং তার মৌলিক বৈধতার অভাব: জনগণের সরাসরি ভোট ছাড়া শাসনকারী কোনো সরকার টিকতে পারে না। তাই, জোর করে মসনদ দখল করে রাখা শাসনব্যবস্থার যে সমূলে উৎখাত অনিবার্য ছিল তা দেশের জনগণ জানতেন। কিন্তু জানতেন না কি উপায়ে হবে সেটা।

সাংবিধানিক কারচুপি ও নির্বাচনী প্রহসন

২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনী এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর শেখ হাসিনার সরকার ও বাংলাদেশী জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায়। সংসদে তার দলের অতি সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে এই সাংবিধানিক ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশে নির্বাচনী সততার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল।

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের দ্বিচারিতা

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার বিষয়টির বিদ্রূপাত্মক দিকটি ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৯৬ সালে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ১০০ দিনের হরতাল-ধর্মঘট-অবরোধ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিল, যা পরে ১৩তম সংশোধনী এর মাধ্যমে সংবিধানে সংযুক্ত হয়েছিল। এই ব্যবস্থা ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন সফলভাবে তত্ত্বাবধান করেছিল। প্রতিবারই লক্ষ্য করা গেছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা জিততে পারেনি। শেখ হাসিনা তাঁর ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালের পর আর কোন নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ন্যস্ত করেননি, এই ভয়ে, পাছে যদি হেরে যান। শেখ হাসিনা এই ব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি হাজির করেছেন, সেটা তাকে একজন উদীয়মান একনায়কতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি হিসেবেই দেখাচ্ছিল জাতির সামনে এবং এই বিষয়টা তিনি জানতেনও বটে। হয়তো এক প্রচ্ছন্ন ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল যে ২০০৯ সালের বি ডি আর হত্যাকাণ্ডের বিচার তিনি এড়াতে পারবেন না। ২০০৬-২০০৮ সালের মতো সেনাসমর্থিত হতে পারে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে  ২০১৪ তে নির্বাচন হলে তিনি যে নির্ঘাত হারবেনই এবং তাঁর বিরুদ্ধে বি ডি আর হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হবে সেটা তিনি বুঝেই স্বৈরাচারের পথ বেছে নিয়েছিলেন হয়তো।

জনগণ এই উল্টো যাত্রাকে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে উপহাস ও রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর, নির্বাচন প্রতিযোগিতাহীন ও জবাবদিহিতাবিহীন একটি নাটকীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।

২০১৪-২০২৪ সালের নির্বাচনঃ গণতন্ত্রের ভাঁওতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বৈধতা হারানো

২০১৪ সালের নির্বাচন: বিএনপির বর্জনের কারণে এটি একপাক্ষিক প্রহসনে পরিণত হয়েছিল, যেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১৫৩টি আসনে নিজেরাই নিজেদের নির্বাচিত করেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সরকার এক ফাঁকা বিজয় উদযাপন করেছিল।

২০১৮ সালের নির্বাচন: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অংশগ্রহণমুলক সত্ত্বেও, এই নির্বাচন "নিশিরাতের ভোট" বলে খ্যাত। এবার আওয়ামী লীগ প্রমাণ করলো যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন একেবারেই সুষ্ঠু নির্বাচন নয়।  বিস্তর অভিযোগের ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাঁধা দেয়া, নির্বাচন প্রচারণা চলাকালে প্রার্থীদের এবং তাদের সমর্থকদের গ্রেফতার, বিরোধী কর্মীদের অত্যাচার, হামলা, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভোটারদের আগে থেকেই ভীতি প্রদর্শন, ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশ করতে না দেয়া, ব্যলট পেপারে নিজেরা সিল দিয়ে দেওয়া, ইত্যাদি নানান কারনে বিশ্বব্যপি কলঙ্কিত হয়েছিল এই নির্বাচন। কিছু নির্বাচনী এলাকায়, ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল—একটি প্রহসন যা নির্বাচন কমিশনকেও শুধু নিন্দনীয়ই করেছিল। ভারত ও চীন ছাড়া আর কেউই এই নির্বাচনকে অনুমোদন দেয়নি, বাংলাদেশের জনগণ তো নয়ই।

২০২৪ সালের নির্বাচন: এইবার মুখোশ সম্পূর্ণ খুলে গিয়েছিল। একটি "নকল বিরোধী দল" তৈরি করা হয়েছিল, আর জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই প্রহসনকে নিন্দা জানিয়েছিল।

পরিণতি: একটি রাষ্ট্রবিহীন জাতি

বৈধ প্রতিনিধিত্ব ছাড়া, জনগণ রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সরকারের আশীর্বাদপুস্ট পুঁজিপতি ও আজ্ঞাবাহক শাসনব্যবস্থার উপর নির্ভরতা জনগণের বিরাগভাজনকে আরও গভীর করেছিল। ২০২৪ সালের মধ্যে, পুলিশ ও জনপ্রশাসন—যারা হাসিনার নিয়ন্ত্রণের মূল স্তম্ভ ছিল—তাদের মধ্যেও বিভেদ দেখা দিয়েছিল, যা তার শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

২০২৪ সালের গণবিপ্লব : বৈধতার চূড়ান্ত হিসাব

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের চাকরি সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ জাতীয় বিদ্রোহে রূপ নেয়, এবং দ্রুত অন্য সব বিষয় ম্লান হয়ে যায়। বরং আন্দোলন দমানোর কাজে নিয়োজিত হাসিনার পেটোয়া বাহিনী নির্দয়ভাবে তরুণদের বুকে গুলী করতে শুরু করলে প্রশ্ন উঠে, কোন প্রাধিকার বলে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের গুলী দিয়ে রাষ্ট্রের সন্তানদের হত্যা করছে? হাসিনার বৈধতার প্রশ্নে উত্তাল হয়ে উঠে দেশের জনগণ। কার্যত সংসদে কোনো রাজনৈতিক বিরোধীদল না থাকায়, রস্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকই তার শত্রুতে পরিণত হয়

২০২৪ সালের শুরুতে পুলিশ বনাম জনপ্রশাসনের বিভেদ তার নিয়ন্ত্রণকে আরও দুর্বল করে ফেলে। শেখ হাসিনার শাসনকে বৈধতাদানকারী প্রজাতন্ত্রের এই দুই গোত্রের মধ্যে বিরাজমান যেসব কর্মকর্তারা একপ্রকার রাজনৈতিক দাপট দেখাতেন, অর্থাৎ পুলিশ এবং জনপ্রশাসন, তাঁরা নিজেরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। তাঁরা একে অপরকে অবৈধ করে ফেলার চেস্টায় যখন লিপ্ত তখন ৫ই আগস্ট ২০২৪ নাগাদ তাদের এক পর্যায়ে দিশেহারা হয়ে তাঁরা শেখ হাসিনাকে খুশী করতে গিয়ে আরও নিষ্ঠুর হওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে। তাই পতনের পরপর—অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আমলা, প্রায় সকল সংসদ-সদস্যরা ও বেশ কিছু দাপুটে বিচারক—পালিয়ে গিয়েছিল, আর সেই সাথে তাঁর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও ধ্বসে পড়েছিল। যদি তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও গ্রহণযোগ্য করতে দিতেন, তাহলে তিনি হয়তো  বিরোধী দলীয় নেতা হয়েও টিকে থাকতে পারতেন। কিন্তু ক্ষমতার প্রতি তার অদম্য লোভে তিনি সেই সুপথে পা বাড়াননি। 

উপসংহার: আত্মঘাতী পতন

শেখ হাসিনার সরকার ভেতর থেকেই মানসিকভাবে দুর্বল ছিলো এই কারনে যে শাসন করার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বৈধতা তাঁর ছিল না। গণতান্ত্রিক নীতিমালা ভেঙে ফেলা, নির্বাচনে কারচুপি এবং ভয়ভীতির মাধ্যমে শাসন করে তিনি রাষ্ট্রকে তার ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত করেছিলেন—যতক্ষণ না জনগণ তাদের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করেছিল – শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে তাঁর নিজের দলীয় বাহিনীতে রুপান্তর করে মাত্রাতিরিক্ত দমন-পীড়ন তাঁর পতন ত্বরান্বিত করে।

কোনো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া না থাকায়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, শাসন, কর্মসংস্থান এবং টেকসই উন্নয়নে তার সাফল্যের দাবিই ছিল তার জনসমর্থন যাচাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি—তবে এই দাবিগুলো ছিল অধিকাংশই মিথ্যার ফুলঝুরি এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। সম্ভবত এজন্যই শুরু থেকেই হাসিনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে হাতিয়ে নিয়েছিলেন। আইনসভা (সংসদ) ও নির্বাহী বিভাগকে দখল করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও ভারসাম্য ধ্বংস করেছিলেন। এজন্য যেসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক সুশাসন নিশ্চিত করবে সেগুলোকে একে একে আঘাত করে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছিলেন। এরপর আসে একটি কার্যত 'সন্ত্রাসের রাজত্ব': ২০০৯-পরবর্তী নির্বাচনগুলো আর নির্বাচন থাকেনি। নির্বাচনের পরিবর্তে ইচ্ছামত মনোনয়নে পরিণত হয়, বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করা হয়, এবং অন্যান্য একনায়কতান্ত্রিক শাসনের মতোই  ক্ষমতাধর অভিজাত-গোষ্ঠী ও সুবিধাভোগী পুঁজিপতিরা প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে প্রতিস্থাপন করে। জাতি হতাশাভরে দেখেছিল কিভাবে তাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা গণতান্ত্রিক ভিত্তি ধ্বসে পড়ছে, যার ফলে বিক্ষোভ বা বিপ্লব ছাড়া কোনো উপায় অবশিষ্ট ছিল না, তা যে কারনেই শুরু হোক না কেন।

post-ads

Bangladesh PM Sheikh Hasina wins historic fifth term in controversial vote | ABC News

Jan 8, 2024 This report by Australian news channel on the final election that Sheikh Hasina won covers the oppression of the opposition who had been demanding for a free and fair election under a caretaker government. Bangladesh's Prime Minister Sheikh Hasina has won an historic fifth term in parliament in an election marred by boycotts and deadly violence. The win didn't come as a surprise as the opposition accused the government of rigging the vote. The only suspense was voter turnout, which was half of what it was at the last election. Not elected by a fair election does not legitimise her rule.

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৫
প্রজাতন্ত্র বনাম জনগণ অবস্থান

প্রজাতন্ত্র বনাম জনগণ: শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার নৈতিক পতন

প্রজাতন্ত্র থেকে স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে প্রস্থান

 প্রত্যেক জাতি তার সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তাঁর রাষ্ট্রযন্ত্রকে ক্ষমতা প্রদান করে। কিন্তু যখন সেই রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে চলে যায়—জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়—তখন প্রজাতন্ত্র এক ধরনের কৃত্রিম সামন্ততান্ত্রিক দুঃশাসনে পরিণত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তাঁর নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখনই আমরা তাকে প্রজাতন্ত্র বনাম জনগণ পরিস্থিতি আখ্যা দেই। সেই শাসন অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রের পতন তখন অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাস সাক্ষী: সোভিয়েত ইউনিয়ন, ওয়াইমার জার্মানি এবং কম্বোডিয়া, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান—সবই এমন অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ফলে ধসে পড়েছিল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশও এই কালো তালিকায় যুক্ত হয়েছে—একটি ভয়াবহ শাসনের মধ্যে দিয়ে।

শেখ হাসিনার শাসনের মৃত্যুঘণ্টা বেজে ওঠে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে, যখন আন্দোলনকারীদের উপর নির্মম দমন-পীড়ন তার সরকারকে জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ঃ একটা যুদ্ধাবস্থা। শেখ হাসিনার সরকার পতনের ঠিক পর পর একটি নির্মম উপহাসকে উন্মোচন করে: যে সরকারি কর্মকর্তারা একসময় হাসিনার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ছাত্র-ছত্রীদের নিগ্রিহ করার কাজে নিয়োজিত ছিল, তারাই বিদ্রোহী ছাত্রনেতাদের তোষণকারীতে রূপান্তরিত হয়ে যায়—তাদের কৃত দমন ব্যবস্থা তাদেরকেই শাসক থেকে রাতারাতি ভৃত্য বানিয়ে দিয়েছে – যেনো এক পরাজিত বাহিনী।

ত্রি-অসুরের মিত্রতা: একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের রূপায়ণ

রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা পৃথিবীর সকল স্বৈরশাসনের মূলে এই তিন অসুরের জোটকে চিহ্নিত করেছেন: ১) বেপরোয়া শাসক দল, ২) অভিজাত-গোষ্ঠী , এবং ৩) গোপন ছায়া-রাষ্ট্রের। এই ত্রয়ী একজন রাষ্ট্র নায়ককে চিরস্থায়ী ক্ষমতার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে প্রথমে তাকে স্বৈরাচারী বানিয়ে দেয়, আর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের সকল নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য ভেঙে দেয় এই  তিন অসুরকে লাভবান করতে।

বেপরোয়া শাসক দল: শেখ হাসিনা একদলীয় শাসন কায়েম করে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী না যতোটা ছিলেন তাঁর চেয়ে বেশি ছিলেন অভিজাত-গোষ্ঠীর প্রধান মন্ত্রী। মূলত, আজীবন ক্ষমতার মসনদ পাবার লোভ তাঁকে ঘৃণ্য, অভিশপ্ত একজন রাষ্ট্র নায়কে পরিণত করেছে। তাঁর পরিবারকে এসব এর সুফল দেবার জন্য পরিবারের সকলকেই অভিজাত-গোষ্ঠীর কর্ণধার বানিয়ে দিয়েছে। ভাবখানা এমন, এটা তো কোন রাষ্ট্র না, যেন ব্যক্তিগত কোম্পানি।

অভিজাত-গোষ্ঠী: এদের কাজ ছিলো একটা কর্পোরেট কাঠামো প্রদান করে লুটপাটতন্ত্রকে বাস্তবায়ন করা। আর মূল শাসককে আজীবন ক্ষমতায় বসিয়ে রাখার লোভ দেখিয়ে তাঁরা একে একে রাষ্ট্রের সকল সম্পদ কুক্ষিগত করে বিদেশে পাচার করে দেয়। শাসক দলের কাজ হচ্ছে এদেরকে সুরক্ষিত রাখা। কারন এদের কাছে থাকে অর্থ লুটপাটের চাবি কাঠি। বিনিময়ে শাসক দল আজীবন ক্ষমতায় থাকার সকল ব্যবস্থাকে অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন করার আশ্বাস পায়। এরাই রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপন্থার নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেয়। 

গোপন ছায়া-রাষ্ট্র: এরা শাসক দলের দ্বারা নির্মিত এক নিষ্ঠুর দল। এরা এক গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে রাষ্ট্র যন্ত্রকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেয়। তারাই শাসক দলের হয়ে বিরোধী দলের দমন-পীড়নের অস্ত্র এবং অভিজাত গোষ্ঠীর নিরাপত্তা বলয় হয়ে ওঠে।

এই জোটের কৌশল ছিল সোজাসাপ্টা: ভিন্নমত নির্মূল করা (যেমন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলীর গুম), অভিজাত-গোষ্ঠীর হয়ে প্রতিষ্ঠান দখল করা (বিচার বিভাগ, সেনাবাহিনী, ইলেকশন কমিশন, পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম), এবং সম্পদ লুটপাট করাকে সহজ করে দেয়া —বিশেষ করে ব্যাংক ও শেয়ার বাজারের মাধ্যমে এবং জাতীয় স্বার্থ বিদেশি শক্তির কাছে বিক্রি করে নিজেদের আখের গুছানো।

২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ভেতরের প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করে দেয়াটা এক বিরাট স্বস্তি এনে দেয় শেখ হাসিনার শাসনকে। একটা ছায়া রাষ্ট্র-যন্ত্রের উত্থানকে সহজ করে দেয় যেটা পরবর্তীতে তাঁর দমন নিপীড়নের হাতিয়ার বনে যায়। আর গায়ের জোরে দায়মুক্তি মিলে যায়। এই অর্জন তাদের ব্যপক সাহস জুগিয়েছিল।

সেনাবাহিনীকে সমর পারদর্শিতা থেকে দূরে রেখে বরং তাদের নিজ দেশের নাগরিকদের নিগ্রিহ করার কাজে নিয়োজিত করার প্রবণতা শেখ হাসিনার দলকে বেপরোয়া করে দিয়েছিল। একের পর বিভিন্ন ভয়াবহ ঘটনাপ্রবাহ মানুষকে আরও ভীত করে তুলতে থাকে শেখ হাসিনার এই গোপন রাষ্ট্র-যন্ত্রকে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির নিজ বাসায় সন্তানের সামনে খুন আজও অমীমাংসিত। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গুম করে ফেলার জন্য এই দেশের বাহিনী যে নিয়োজিত হতে পারে কখনো এদেশের মানুষ ভাবতে পারেনি।  একটা সম্পূর্ণ নতুন ভয়াবহ পরিস্থিতি। জনাব এম. ইলিয়াস আলী, এবং জনাব সালাহউদ্দিনের গুম হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাজ এবং নাসিরউদ্দিন পিন্টু সাহেবসহ হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যা বলে দেয় যে রাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের বাহিনী।

বিস্ময়করভাবে, এসব ঘটনার সাথে ভারতীয় স্বার্থের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। বিশেষ করে, ইলিয়াস আলী ভারতের নির্মীয়মাণ টিপাইমুখ বাঁধের কঠোর সমালোচক ছিলেন, যা সিলেটের আমলশীদ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ ছায়া রাষ্ট্র নির্মমভাবে দমন করত। এতে স্পষ্ট হয়েছিল যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (RAW) এই ত্রি-অসুর জোটের অংশ হয়ে উঠেছিল।

জনগণের জাগরণ

শুরুর দিকে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের দমন-পীড়নকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করত। কিন্তু ২০২০-এর দশকে এসে এই মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়: গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, এবং ভারতের মতো বিদেশি শক্তির সাথে ছায়া-রাষ্ট্রের প্রকাশ্য আঁতাত—সবই তাদের হিংস্র প্রকৃতি প্রকাশ করে।

সরকারি চাকরি, একসময় যা সম্মানের বিষয় ছিল, তখন হয়ে পড়ে নিজ দলের লাঠিয়াল বাহিনীর প্রতীক। প্রশাসকরা অবাধে লুটপাটে মেতে ওঠে। এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন তরুণ প্রজন্মের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন এনে দেয়: দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থায় যোগ দেবে, না এর শুদ্ধির লড়বে?

অনিবার্য পতন

রাষ্ট্র-যন্ত্রকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ২০২৪ সালে এসে শেখ হাসিনার সরকার যে চাপে পড়ে গিয়েছিল:

আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা: মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘের রিপোর্টসমূহ সরকারকে ধিক্কার জানায়।

লুটপাটতন্ত্রের অর্থনৈতিক: অভিজাত-গোষ্ঠী ব্যাংক, সেবা খাত ও শেয়ার বাজার খালি করে ফেলে।

সামরিক অসন্তোষ: আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবার উপক্রম হলে, নিজ দেশে বেসামরিক আন্দোলন দমনে নিয়জিত হওয়ার মতো আত্মঘাতীমুলক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করাকেই সমীচীন মনে করে।

প্রজাতন্ত্র বনাম জনগণের দ্বন্দ্ব জুলাইতে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ, রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিরা শেখ হাসিনার দমন নীতি পরিত্যাগ করে—নৈতিকতার কারণে নয়, বরং আত্মরক্ষার তাগিদে। সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে বিপ্লব একটি সার্বজনীন সত্যকে উন্মোচন করে: যে শাসকগোষ্ঠী জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রতিশোধের শিকার হয়।

এটি একটি সুস্পষ্ট শিক্ষা: রাষ্ট্রযন্ত্র কখনো জনগণের শক্তির চেয়ে বড় নয়। যখন জনগণ বুঝতে পারে যে তারা তাদের নিজস্ব প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে, তখন শাসনব্যবস্থা অনিবার্যভাবে পতিত হয়।

উপসংহার: একটি সতর্কবার্তা

বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্র বনাম জনগণের মুখোমুখি অবস্থান যেন শেক্সপিয়ারের "ম্যাকবেথ" নাটকের প্রতিধ্বনি: "যাহাই ভালো, তাহাই মন্দ; আর যাহাই মন্দ, তাহাই ভালো।"

রাষ্ট্রযন্ত্র, যাকে সবসময়য় নিতে হয় জনগণের অভিভাবকের ভূমিকা। পক্ষান্তরে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের নিধনের শাসন চালায় বুঝতে হবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিকল করে দেয়াই তখন জনগণের কাজ হয়। ভবিষ্যতের সংস্কারকদের জন্য শিক্ষা একটাই: যে প্রজাতন্ত্র তার জনগণের কণ্ঠরোধ করে, সে আর প্রজাতন্ত্র থাকে না। এই মৌলিক দ্বন্দ্ব, "প্রজাতন্ত্র বনাম জনগণ"-এর টানাপড়েন, প্রথমে সেই শাসনযন্ত্র, পরে সেই রাষ্ট্রের জন্য অবশ্যম্ভাবী পতন ডেকে আনে। 

post-ads

‘দিল্লিতে গু/ম হওয়া’ ব্যক্তিকে আ/সা/মী করা হয় জাহাজবাড়ির ঘটনায় | Bangla Edition

The Mother and the Monster: After Sheikh Hasina, what's next for Bangladesh? | 101 East Documentary

May 1, 2025. Enforced disappearances, torture, extrajudicial killings: The human rights abuses allegedly committed by former Prime Minister Sheikh Hasina’s regime have left scores of Bangladeshis scarred and traumatised. After a student-led movement overthrew the government in 2024, the full extent of the suffering is finally coming to light as an interim government, led by 84-year-old Nobel Peace Prize winner Muhammad Yunus, tries to rebuild a shattered nation. From repairing the demoralised police force to seeking justice for victims and presiding over unstable relations with India, it’s a daunting task. How will Bangladesh rise from the rubble of a dictator’s rule? 101 East investigates.

শেখ হাসিনার চলে যাওয়ার দিন যা ঘটেছিল

Sep 7, 2024 What transpired on the day Sheikh Hasina fled has been documented in minute detail. This moment marked the culmination of an intensifying standoff between the state and its people. The situation demands serious analysis, as it reveals how Sheikh Hasina’s overconfidence fuelled a persistent and destructive collision between the government and its citizens, ultimately triggering a mass uprising. The transformation of public servants into instruments of state oppression came at a steep cost—not only for Sheikh Hasina herself, but for the entire nation.

“Where No Sun Can Enter” A Decade of Enforced Disappearances in Bangladesh

Human Rights Watch

Enforced disappearances: 1,600 complaints filed, majority against RAB. 400 complaints have been reviewed so far

Dhaka Tribune

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৪
দুর্বল রাজনৈতিক ভীত 

একটি দুর্বল রাজনৈতিক ভীত, পতন শুধু সময়ের অপেক্ষাঃ 

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি আশ্চর্য বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল: একটি প্রজাতন্ত্র যা একদিকে নিজেই নিজের নাগরিকদের নিগ্রিহ করেই যাচ্ছে, আর অপর দিকে অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্র (ডিপ স্টেট) জাতীয় সার্বভৌমত্বকে খর্ব করেই চলছে—দুটিই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মানুষের উপর চরম অর্থনৈতিক নিপীড়নের প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেয়। পৃথিবীর যেকোনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা সাধারণত এমন প্রজাতন্ত্র-বনাম-জনগণের মুখোমুখি অবস্থান সহজেই পেশীর জোরে সামলে নিতে পারে। এবং শেখ হাসিনা আগেও এরকম কঠিন জনরোষ কাটিয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু এবার কেন ২০২৪ এ এসে তার শাসন রাতারাতি ধ্বসে পড়লো?

উত্তরটি লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক কাঠামোকে ঠুনকো বানিয়ে দেবার মধ্যে, যার দায় কেবল শেখ হাসিনার এবং তাঁর দেশী বিদেশী উপদেষ্টাদের

খোলসে পরিণত হওয়া একটি ব্যবস্থার ধ্বস

হাসিনার ভয়ঙ্কর ভুল ছিল রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা নিজের কাছে কেন্দ্রিভুত করতে গিয়ে, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে একটা তাসের ঘরে পরিণত করে ফেলা। উপরন্তু, সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী (২০১১) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে নির্বাচনী নিরপেক্ষতার সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয় – যেখান থেকে তার প্রতিযোগীবিহীন রাজনৈতিক আধিপত্যের সূচনাঅবস্থাটা শেষ পর্যন্ত এমন দাঁড়ায় যে ২০২৪ সালে তিনি সংসদের জন্য কোনো উপযুক্ত বিরোধী দলই খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তাই হাস্যকরভাবে তিনি নিজ দলের একটি অংশকেই নিজের বিরোধী দল বানিয়ে নিয়েছিলেন, এক ধরনের "গৃহপালিত বিরোধী দল" । আর তাঁর নাম তিনিই দিয়েছেন “ডামি দল”। এভাবে বাইরে গণতন্ত্র এবং ভেতরে চিরস্থায়ী স্বৈরশাসন কোন রাজনৈতিক কাঠামো হতে পারে না।

যখন পতন হয়, তার রাষ্ট্র কাঠামো কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে পডে: মন্ত্রিপরিষদ, ৩৩০ সংসদ সদস্য, পুলিশ প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা, মেয়ররা, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও অদৃশ্য হয়ে গেলেন—অনেকে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করবেন না পদত্যাগ করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। হাইকোর্টের বিচারক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী মহল আত্মগোপনে চলে গেলেন; এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জনাব শামসুদ্দিন মানিক, ভারতের সীমান্তবর্তি জঙ্গলে দালালদের সহায়তায় পালানোর আগ মুহূর্তে আটক হয়েছিলেন। অনেকেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে নিজেই নিজেদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন। তাদের পাশাপাশি, প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী, গৃহ পালিত বিরোধী দল, উচ্চ পদস্থ ব্যাংকার এবং এমনকি ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারাও বাদ গেলেন না। হয় তাদের কাঠামোগত শক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, নৈতিক ভিত হারিয়ে গিয়েছিল, নয়তো তারা প্রকাশ্যে মুখ দেখাতে পারছিল না। বুঝা গেলো, রাষ্ট্র কাঠামোর ক্ষমতার বিকেদ্রিকরন বলতে কিছু ছিল না। তাই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু পরাস্থ, তাই তাদের কাছে আর কোন ক্ষমতা রইলো না যার বলে তাঁরা শাসনকর্ম  চালাতে পারে। অর্থাৎ একটা দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামোর অথর্ব সদস্য ছিলেন এইসব সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিগণ অথবা কাঠামোটাই এমন ছিল যে তাঁরা অথর্ব হতে বাধ্য হন। অবশ্য রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্র গঠনে যেমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল তিনি অবশ্য তেমনটাই করলেন, শপথবাক্য পড়িয়ে নতুনদের রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তুলে দিলেন যারা ঠিক করবে রাষ্ট্র কাঠামো কেমন হবে ভবিষ্যতে।
 

অর্থাৎ বাইরে গণতন্ত্রের লেবাস এবং  ভেতরে স্বৈরতন্ত্র - কোনো রাজনৈতিক প্রাণশক্তি ছিল না কেবল রাষ্ট্রের কাঠামোতে।

ছায়া রাষ্ট্রের উত্থান এবং রাষ্ট্রের বিরাজনীতিকরন

১৬ বছরে হাসিনা রাষ্ট্রযন্ত্রের  ভেতর এক অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে (ছায়া রাষ্ট্র) বিকশিত হতে দিয়েছিলেন। এতে করে দলের ভেতরে এবং বাইরে অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবাণ, দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদগণকে রাজনৈতিক কাঠামো থেকে দূরে রাখা হয়। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণশক্তি থেকে দেশ বঞ্চিত হয়। একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদ যেমন স্টেরয়েডের নির্ভরতায় নিজের স্বাভাবিক দক্ষতা হারায় এবং শেষ পর্যন্ত ডোপিং টেস্টে এসে ফেল করে, আওয়ামী লীগের নেতারাও 'ছায়া রাষ্ট্রের'-এর কৃত্রিম সমাধানের প্রতি তেমনই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের নবীন গণতন্ত্রকে একটি ছদ্ম-সাম্রাজ্যবাদী কাঠামো দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছিল, যা জনপ্রতিনিধিত্বমুলক শাসন ব্যবস্থা থেকে আওয়ামী-লীগকেও  বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। রাষ্ট্রযন্ত্র সেই শুন্যতা পূরণের কাজ লুফে নেয়। প্রজাতন্ত্রের সেইসব কর্মকর্তাদের নির্বাচন কমিশনার, প্রিজাইডিং অফিসার এবং স্থানীয় প্রশাসকদের খুঁজে বাছাই করা হয়েছিল যারা নির্দেশনামতো ফলাফল ঘোষণা করবেন, ক্ষমতাসীনদের জন্য। এভাবে রাজনৈতিকভাবে আসা একটা শাসক দল যে অরাজনৈতিকতা দিয়ে তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করবেন, তা  দেশকে অবাক করে দেয়। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থাকে তিন মেয়াদে আজব বৈধতা দিয়েছিল। এমন নজীর, বাংলাদেশ আমলে কেন পাকিস্তান আমলেও দেখা যায় নি।

এভাবেই প্রজাতন্ত্র একটি স্বৈরতন্ত্রের রূপ ধারণ করতে থাকে। নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচারবিভাগের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে প্রধান মন্ত্রীর দফতরে সন্নিবেশিত হয়। এবং এরা সবাই হাসিনার ইচ্ছার প্রতিফলক হয়ে গিয়েছিল—নির্মম হলেও সত্য যে তিনি যেনো এই অবস্থাটা উপভোগ করতেন, এমনকি নাগরিকদের কষ্টের মধ্যে অকপটে তাঁর পিয়নের দুর্নীতি কিংবা খাদ্যমূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রসিকতাও করতে ছাড়তেন না।

একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা হয় ক্ষমতার পৃথকিকরনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে এই পৃথকীকরণ ধাপে ধাপে নিশ্চিত করা হয়েছে ৫০ বছর ধরে যাতে রাষ্ট্রের কোন একটি শাখা বা গোষ্ঠী প্রাধান্য না পায়। রাষ্ট্র রক্ষা হয় ভারসাম্য অর্জিনের মাধ্যমে, রাস্ট্রের একটা শাখা অন্য শাখাকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দেবার  ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে, ও আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার সমন্বয়ে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, ক্ষমতা পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হয় সরকারের কার্যকারিতাকে তিনটি স্বতন্ত্র শাখায় ভাগ করে—

১) আইন প্রণয়ন শাখা (সংসদ),
২) নির্বাহী শাখা (মন্ত্রিপরিষদ),
৩) বিচারিক শাখা (আদালত)

প্রথমত, প্রতিটির নিজস্ব কর্তৃত্ব, দায়িত্ব ও গঠনতন্ত্র রয়েছে। ক্ষমতার সুষম বণ্টন রাস্ট্র কাঠামোকে জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া রোধ করে। দুর্ভাগ্যবশত, এই তিনটি শাখাই নীরবে একীভূত হয়ে শেখ হাসিনাকে তিনটিরই মালিক বানিয়ে দিয়েছিল অথবা বানিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল—প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা তার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল এতোটাই যে, তিনি এই বিপুল ক্ষমতা সামলাতেও পারছিলেন না।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের ক্রান্তিকালে স্বপ্রণোদিতভাবে একটি বিভাগ আরেকটির পরিপূরক হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটাই একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো । কিন্তু বাংলাদেশে এটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল শেখ হাসিনার হাতে, বিশেষ করে ২০১১ সালের পর পর।

একটি উদাহরন না দিলেই নয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি হলেন প্রজাতন্ত্রের প্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান। কিন্তু বিদ্রূপের বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতি নিয়োগও প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকত। প্রজাতন্ত্রের প্রধান হিসেবে এমন ব্যক্তিকে শেখ হাসিনা চুড়ান্ত করেছেন, যিনি নিজেই শেখ হাসিনাকে অবনতচিত্তে কদমবুসি করতেন। এমনভাবে রাজনৈতিক কাঠামো ও ভারসাম্য ধ্বংস করা হয়েছিল, যাতে সব স্বাধীন প্রতিষ্ঠান একক দফতর—প্রধানমন্ত্রীর—ইচ্ছার দাসে পরিণত হয়, আর ছায়া-রাষ্ট্র সেই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার চূড়ান্ত নির্বাহী শাখা হয়ে ওঠে। কোনো নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান—মুক্ত সংবাদমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন, আদালত, জনপ্রশাসন, পুলিশ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক—নিরপেক্ষ থাকতে পারেনি যা রাজনৈতিক কাঠামোকে কেবলই দুর্বল থেকে দুর্বলতর  করেছে।
 

বল প্রয়োগ কেন ভেস্তে গেলো?

অতীতে হাসিনা রাস্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদলকে এবং অনেক আন্দোলন দমন করেছে। কিন্তু এবার সেই ইস্পাত-কঠিন শাসনব্যবস্থা কাগজের মতো ভেঙে পড়ল কেন? রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা যেহেতু এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত ছিল, সেই ব্যক্তির পতন মানে রাষ্ট্রের শাসন বাবস্থার অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাওয়া - যার মুলে একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক কাঠামোকেই শুধু দায়ী করা যায়। পৃথিবীর আরও অনেক দেশে স্বৈরশাসন বিরাজমান থাকলেও (চীন, রাশিয়া বা সৌদি আরব, প্রমুখ) সেসব রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার কোন না কোন বিন্যাস সেই রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক সমস্যাগুলো রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। পক্ষান্তরে, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোন রাজনৈতিক অঙ্গই ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের জনবিপ্লব ঠেকাতে কাজে আসেনি —টাকা বানাতে ব্যস্ত চাটুকাররা পালানোর পথ খুঁজছিল।

বাকশালের দ্বিতীয় সংস্করণ: একটি পুনরাবৃত্ত ট্র্যাজেডি

শেখ হাসিনা অতীতেও অনেক কঠিন রাজনৈতিক ঝড় সামলে উঠেছিলেন। আর এটি আওয়ামী লীগের প্রথম পতন নয়। ১৯৭৫ সালে বাকশালের অধীনে স্বৈরাচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা প্রায় দলটিকে রাজনীতি অঙ্গন থেকে মুছে দিয়েছিল। ২০১১–২০২৪ সালের আওয়ামীলীগকেও দেখা গেলো বাকশালের দ্বিতীয় সংস্করনরূপে। তাই একই পরিনতি ভোগ করতে হল। সেই সাথে এই ধ্বস এই জাতিকে এক বিশাল সঙ্কটে নিক্ষেপ করেছেঃ ধ্বংসপ্রাপ্ত শাসনব্যবস্থা যে সুশাসন বিলুপ্ত করে ফেলেছে তা পুনর্বিন্যাস করতে এ জাতিকে আবার রাস্ট্রগঠন একদম গোড়া থেকে কাজ শুরু করতে হবে। যদি সত্যিকারের রাজনৈতিক ক্ষমতা-বণ্টন এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় থাকত, তাহলে শেখ হাসিনা দেশ ও তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বাঁচাতে পারতেন।

রাষ্ট্রকে প্রায় নিজের বাক্তিগত সম্পদ বানিয়ে ফেলায় আজ, পাসপোর্টহীন ও রাষ্ট্রহীন অবস্থায শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল। রাষ্ট্রের প্রায় সকল স্থাপনা নিজের পরিবারের নামে নামকরন করে পৃথিবীর অন্যান্য পতিত স্বৈরশাসকদের ক্লাবে নিজের নামটি লিখিয়ে নিয়েছেন নিজের অজান্তে। যারা বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসনের স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। অতিরিক্ত ক্ষমতার ভার নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা যেন সার্কাসের রশির উপর ভারসাম্য হাঁটার মতো—আর তাঁর জন্য অতি মানবীয় ক্ষমতা ও মেধার প্রয়োজন, যা পৃথিবীতে অত্যন্ত দুর্লভ।

post-ads

A Review by the Daily Amar Desh on the fate of Awami League's political future explains how flimsy is the political strength of the ruling party and so as the republic

Funny Speech by Femail MP in the Parliament

Jun 21, 2017. While parliamentary debates should exemplify rigorous discourse, a recent budget speech by an MP—reportedly a political selectee—deviated sharply from this standard. Her rudimentary grasp of the subject matter inadvertently trivialised a critical national discussion, inviting scrutiny of the appointment process for lawmakers. When manifestly unqualified individuals are elevated to the legislature, it does more than embarrass—it degrades the institution’s constitutional role. The Hasina administration’s apparent indifference to such appointments risks normalising dysfunction of the constitutional organs, with long-term consequences for democratic accountability.

সেনাপ্রধান বুকে পাথর চাপা দিয়ে ইউনূসকে মেনে নিয়েছিলেন: আসিফ

May 21, 2025 This interview with the chief coordinator of the mass movement, now serving as a senior cabinet adviser, offers a revealing insight into the regime’s final days. His account exposes the profound fragility of Sheikh Hasina’s administration: her party exhibited no political will to reform, while the constitutional architecture provided no lawful avenue for transition. With institutional channels rendered obsolete, her ousting became unavoidable, yet it was ultimately achieved through popular uprising rather than constitutional process. Hence this was a regime collapse precipitated by force Notably, he discloses why the military refrained from confronting the public fury, a decision rooted in concerns over the armed forces’ international standing, given the regime’s eroding legitimacy and precarious political foundations.

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী?

In his incisive analysis for Jamuna TV on 3 March 2025, Barrister Andalib Rahman Partho laid bare the structural vulnerabilities of the Awami League under Sheikh Hasina’s leadership. His examination revealed the grim reality of Bangladesh’s political landscape during her 15-year tenure: a system where power was relentlessly centralised in her personal office, leaving state institutions hollowed out and her party devoid of autonomous leadership. Such was the degree of this consolidation that her removal inevitably precipitated the regime’s collapse, mirroring the fate of political parties whose existence becomes inseparable from their figurehead. The parallel is stark: just as Hitler’s identity subsumed the Nazi Party, so too did Hasina’s dominate the Awami League and, by extension, the Republic itself.

খুলনা-১ আসনে কী হয়েছিল?

খুলনা-১ আসনে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ‘গরমিল'-এর খবরের কারণে দু'জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা হয়েছে৷ একজনকে তিনদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে৷কেন রিমান্ডে নেয়া হলো সাংবাদিককে? আসলে কী হয়েছিল সেদিন? This report in the German press details how Sheikh Hasina co-opted state institutions, compelling public servants to become complicit in fabricating electoral results. When civil servants can be forced to manufacture democratic outcomes, the very foundation of political representation collapses—rendering the constitutional order meaningless.

DW Online

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #৩
দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও চরম দুঃশাসন

দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুঃশাসনের চূড়ান্ত: শেখ হাসিনার শাসন পতনের নেপথ্য কারণ

সাধারণ জনগণের চোখে, এটি ছিল সম্ভবত শেখ হাসিনার শাসন পতনের প্রধানতম কারন। দুর্নীতি, লুটপাট এবং লোভের ব্যাপকতা এমন এক মাত্রায় পৌঁছায়, যা কল্পনারও বাইরে। তার শাসনামলে বাংলাদেশ পরিণত হয় বিভিন্ন দেশি-বিদেশি দুর্জনদের ‘স্বর্গে’।

২০১৭ সালের দিকে অর্থনীতি তখনো মুখ থুবড়ে পড়েনি এবং অতি সত্বর প্রচলিত অর্থায়নের উৎস শুকিয়ে যাবার ঠিক আগ মুহূর্তে, শেখ হাসিনার সরকার বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে, এক প্রকার দেশের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে, ঋণ নেওয়া শুরু করে। সে সময় সাধারণ মানুষ 'মেগা প্রকল্প'-এর নামে লুটপাটের ব্যাপারে সন্দিহান থাকলেও এর নানান দিক তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। ২০২৩ সালে আইএমএফ এর ঋণের শর্তের কাছে মাথা নত করে শেখ হাসিনা আর জাতীয় ঋণের প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে রাখতে পারেনি। সেদিন থেকেই জনগণের কাছে সরকার তার নৈতিক বৈধতা হারায়। এক দশক ধরে তৈরি করা হয়েছিল এই বয়ানঃ “আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র”। তাই এমন বলা হতো, “শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার”। সরকারের বানানো অর্থনীতির বিভিন্ন সুচকে শেখ হাসিনার হাতে যে যাদুর কাঠি ছিল ২০২২ সাল অবদি তা বলাই যেতো।  

কিন্তু ২০২৩ সালের শুরু থেকেই নির্জলা যে সত্য উন্মোচিত হতে থাকে সেটা- বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকৃতপক্ষে একপ্রকার জালিয়াতি ছিল — মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে। ২০২৩ সালে গত এক দশকের দুর্নীতি, অর্থ পাচার, প্রতারণামূলক ঋণ এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা থলের বিড়ালের মতো বেরিয়ে পড়ে—জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান প্রতিবেদনে ছেয়ে যায় আর সেটা কেবলই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কল্যাণে।

লুটপাটতন্ত্র দ্বারা সংজ্ঞায়িত এক দুঃশাসন

দুর্নীতি লুকানো খুব কঠিন। ধনকুবের তো লুকিয়ে রাখার জন্য সম্পদ গড়ে তুলে না, ভোগ করার জন্যই করে। আবার রাষ্ট্রীয়ভাবেই প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসখ্যানের মধ্যে আটকে থাকা অসংগতিগুলোই একপ্রকার দুর্নীতির আলামত বহন করছিল। তাই এসব বিশ্লেষণকে অপতথ্য আখ্যা দেয়া শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষে দুস্কর ছিল বিধায় বাংলাদেশের সকল সংবাদ মাধ্যমে দুর্নীতি এক প্রকার হয়ে ওঠে প্রধান আলোচ্য বিষয়—সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে এরকম বিষয় মুখরোচক হয়ে উঠে। শেখ হাসিনার পতনের পর তো কথাই নেই – তাঁর সরকারের দুর্নীতি একেবারে যেন এক বাঁধভাঙ্গা সংবাদে পরিণত হয় গণমাধ্যমে। তাই প্রশ্ন জাগে: ২০০৮ সালের নির্বাচন, সরকার গঠন, দমন-নিপীড়ন আর রাজনৈতিক কাঠামো ও সুশাসন ধ্বংস করা কি শুধুই শেখ হাসিনার পরিবারকে ধনী করে তোলার প্রকল্প ছিল? রাষ্ট্রীয় কোষাগার কি শুধুই লুটপাটের জন্য?

এই পরিকল্পিত লুটপাট সফল করতে শেখ হাসিনা তাঁর বিশ্বস্ত লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করে।  বিশেষ কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয় যেগুলো তাঁর লুটপাটতন্ত্রকে সহজ করে দিবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁর মধ্যে অন্যতম। সবশেষ গভর্নর ছিলেন এর এক জলজ্যন্ত উদাহরন। ২০২৩ সাল থেকে ইনি লুটপাটে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, মনে হচ্ছিল পলায়ন সন্নিকটে তাই অতিদ্রুত সব লুটপাট সম্পন্ন করতে হবে, এমন একটা অবস্থা বিরাজ করছিল।

অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার বদলে সরকার সেসব কর্তাব্যক্তিদের উৎসাহিত করতে থাকে। ২০২০ সালের পর থেকে দুর্নীতি এমন বেপরোয়া রূপ নেয় যে, এর ক্ষত বহু দশক ধরে বয়ে বেড়াতে হবে জাতিকে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের তিনদিন পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করেন—যা প্রমাণ করে যে, বহু বছর যাবৎ সুশীল সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে অভিযোগ উঠছিল, তা সত্য ছিল। জাতীয় কোষাগার রক্ষার কথা যাদের, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো—দুই প্রাক্তন গভর্নর এবং তাঁদের উপ-গভর্নরসহ—এ লুটপাটে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।

শেয়ারবাজার: প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণার থাবা

শেয়ারবাজারও পড়েছিল এই দুঃশাসনের থাবা। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় হরণ করে কিছু সুবিধাভোগীকে ধনী করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একের পর এক ধস, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধ্বংস করে দেয়। এই দুর্নীতিগুলো নিছক দুর্ঘটনা ছিল না—এগুলো সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের দ্বারা সংঘটিত এবং শাসকগোষ্ঠী দ্বারা প্রশ্রয়প্রাপ্ত ছিল। বিশেষ করে ২০২০ সালের পর, দুর্নীতি রূপ নেয় একপ্রকার ‘শিল্প’-এ।

এক নজরে কিছু উল্লেখযোগ্য শেয়ারবাজার বিপর্যয়:

·         ১৯৯৬ শেয়ারবাজার ধস: ৩০০% অতিমূল্যায়িত বেলুনের মতো ফুলে উঠে পরবর্তীতে চুপসে পড়ে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারান।

·         ২০১০–১১ ‘গ্রেট ফল’: অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ ও অতিমূল্যায়িত নিম্নমানের শেয়ার ধসের কারণ। সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা (৬ বিলিয়ন ডলার সমতুল্য) ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করলেও, বাজার মূলধন ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে আসে ৩০ বিলিয়ন ডলারে।

·         ২০২০–২১ কোভিড মহামারি ধস: নীলমণি শেয়ারগুলো তীব্র ধসের সম্মুখীন হয়। স্বল্পমেয়াদি প্রণোদনায় কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও, এটি ছিল ফাটকাবাজির ফল, প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়।

·         ২০২২ অস্থিরতা: পুঁজিবাজার হঠাৎ করে ১৫% পড়ে যায়, এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি পুজিবাজারে তারল্য সংকট দেখা দেয়। তাই অন্য কোনভাবে এই পতন ঠেকানো সম্ভব ছিল না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যত ব্যর্থ হয়।

·         ২০২৩ আর্থিক খাতের সংকট: ঋণ খেলাপি ও ব্যাংক কেলেঙ্কারি তীব্র আকার ধারণ করে। তাই ব্যঙ্কের শেয়ারগুলো চরমভাবে অবমূল্যায়িত হতে থাকে যার প্রভাব অন্য সব শেয়ারে এসে হাজির হয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্থনীতি বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র কমিশন গঠন করে। তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছিল। এই প্রতিবেদনের একটি কপি এই নথির সাথে সংযুক্ত।

এই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এমন এক ক্ষতি করেছে, যা হয়তো তিন দশকেও পূরণ হবে না। ৫০–৬০ বছরে গড়ে ওঠা সুশাসনের রক্ষাকবচগুলো একে একে ভেঙে ফেলা হয়—পরিকল্পিতভাবে। যার ফলে জাতি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ব একপ্রকার হতবাক হয়ে পড়ে।

পরে, ফিরে তাকালে বোঝা যায়—যা শুরু হয়েছিল গণতন্ত্রের নামে, তা শেষ হয় এক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ লুটপাটতন্ত্রে। সুশাসনের অবস্থা এমন ছিল, কোনটা যে ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা জাতিকে একটা বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, ঠিক যেমন ম্যাকবেথের ডাইনীদের মতো করে — “অসুরই শুদ্ধ, অশুদ্ধই সুর (Fair is foul, and foul is fair)” — শাসনযন্ত্র এতটাই "অশুদ্ধ" দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল যে, ভীষণ অসুরকেও মেনে নিতে হয়েছে দেশবাসীকে শুদ্ধ বলে।

২০২৩ সালে আইএমএফ ঋণের তথ্য সামনে আসাতেই জাতির উপর ঋণের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পায় এবং সরকারের অস্তিত্ব রক্ষার নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায়। এর পরই সব মিথ্যার জট খুলে যায়—সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ একযোগে উন্মোচন করে দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং প্রতারণামূলক ঋণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ।

এইভাবেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সুশাসনের সম্পূর্ণ ভাঙন হয়ে দাঁড়ায় শেখ হাসিনার শাসন পতনের অন্যতম বৈধ ও প্রধান কারণ।

post-ads

State machinery was used and abused in form of plunder for personal gain of the regime top. This video is unfortunately and example of thousands of others. This was never precedented in the history of Bangladesh

‘কানাডার ৪০০ বাড়ির বেশিরভাগ মালিকই আমলারা’ | White Paper |

'লুটেরা সহযোগী' প্রশাসন কি ঘুরে দাঁড়াবে, কীভাবে সেটা সম্ভব?

যে কারণে আলোর মুখ দেখেনি বঙ্গভ্যাক্স ভ্যাকসিন | Bangavax Vaccine | Kalbela

সম্পত্তি বেচতে ক্রেতা খুঁজছেন নসরুল হামিদ

ব্যাংকে কেন ফরেনসিক অডিটের সিদ্ধান্ত? | Cenbank To Launch ... YouTube · The Business Standard · Dec 11, 2024

Dec 11, 2024. The necessity of a forensic audit for Bangladesh’s banking sector reveals a collapse of oversight so profound it suggests state-sanctioned looting. This institutional decay has fuelled economic instability, eroded public trust, and normalised the silencing of opposition—a trifecta of crises with roots in financial malpractice.

No Comment Yet
Overall Score: 0.0 / 10 |

কারণ #২
নিঃশেষিত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি

ধ্বংসপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি

২০২৩ সাল থেকে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে, যেটাকে আমরা মনে করছি শেখ হাসিনার সাম্রাজ্য পতনের একটি অন্যতম কারন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে "ডামি নির্বাচন" নামে কুখ্যাত একটি প্রহসনমূলক নির্বাচন পরিচালনার অভিযোগে তিনি প্রায় “এক ঘরে” অবস্থায় পৌঁছান বিশ্ব-দরবারে। তবে আন্তর্জাতিক সমালোচনার সূত্রপাত হয় আরও আগে থেকেই, ২০১৮ সাল থেকেই, যখন তার পুনর্নির্বাচন,“নিশিরাতের ভোট” বলে কুখ্যাত, বিশ্বব্যাপী অগণতান্ত্রিক ও দুর্বৃত্তসম  হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ২০২৪ সালে এই প্রহসন সম্পূর্ণতা পায়: হাসিনা নিজেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন, পাশাপাশি তিনি নিজেই যাদের "ডামি প্রার্থী" বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, এমন একটি “মনোনীত বিরোধী দল” তৈরি করেন। রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় করে বিশ্বদরবারে "ডামি নির্বাচন" আর অজানা থাকে না বিশ্ব সংবাদমাধ্যমগুলোর কল্যাণে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আর কখনই যে অবাধ নির্বাচন করতে দিবে না সেটাও স্পষ্ট হয়ে যায়। ভারত ও চীন ছাড়া খুব কম দেশই তার সরকারের সাথে সম্পর্ক রেখেছে; আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে একনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানাতে থাকে। তার শাসন বৈশ্বিকভাবে আরও অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে, কারন এসব আন্তর্জাতিক অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য স্বৈরাচারের মতোই ছিল অবিচল।

আন্তর্জাতিক গণ-মাধ্যমের ব্যপক নজরদারি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ক্রমবর্ধমানভাবে তাকে একেবারে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর হতেই একটু একটু করে একজন কর্তৃত্ববাদী নেতা হিসেবে চিত্রিত করছিল এবং সেটা সঙ্গত কারণেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে তার সরকারের কর্মকাণ্ড জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার তীব্র নিন্দা ডেকে আনে। ২০১৯ সাল থেকে যত আন্তর্জাতিক তদন্ত বেড়ে যায়ঃ তার সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ জব্দের মুখোমুখি হয়েছেন। আর এটা একটা বড় ধাক্কা, কারন শেখ হাসিনার আমলা এবং রাজনৈতিক সঙ্গীরা তাদের পাচারকৃত অর্থ পশ্চিমা দেশেই সম্পদ গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করতেন।  বড় বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সরাসরি তার সাক্ষাৎকারে তাকে কর্তৃত্ববাদী বলে উল্লেখ করতে শুরু করে। কূটনৈতিক কৌশলে দুর্বল তাঁর সরকার এই ভাবমূর্তির সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।

বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা


২০১৯ সাল থেকে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শুরু করে—বিশেষ করে র‍্যবের বিরুদ্ধে। জবাবদিহিতার পরিবর্তে হাসিনা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে নিজের ভাবমূর্তির আরও ক্ষতি করেন। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া যেটা তার একমাত্র কূটনৈতিক সাফল্যকেও ম্লান করে দেয় ২০২৩ সাল নাগাদ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রশ্নের জবাব না দেওয়া এবং বেপরোয়া বক্তব্য বিশ্বব্যাপী তার পক্ষপাতদুষ্ট স্বৈরাচারকে উন্মোচিত করে। দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া বক্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উচ্চারিত হতে থাকে, যেমন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ঢালাওভাবে "রাজাকারের নাতি" বলে আখ্যায়িত করা, বেগম খালেদা জিয়াকে বেশি কথা বললে আবার জেলে ঢুকিয়ে দেয়া, “পদ্মা নদীতে ফেলে দেয়া”, ডঃ মোঃ ইউনুসকে পদ্মা নদীতে “চুবনী দেয়া” অত্যন্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তি হিসেবে গণ্য হতে থাকে বিশ্বব্যপি।    

লবিস্টদের প্রচেষ্টা ও ব্যর্থতা


ভারতীয় প্রচারমাধ্যমগুলো তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে, যে প্রচেষ্টা চালায় তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ২০২৩ নাগাদ প্রায় সব বড় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাসহ, জোরপূর্বক গুম ও ভিন্নমত দমনের বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। দেশের ভেতর দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে হাসিনা বিদেশে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য তার দলের মধ্যে কোনো বিশ্বস্ত মুখপাত্রও তৈরি করতে পারেনি। ক্রমশঃ তাকে বড় আন্তর্জাতিক ফোরামে বয়কট করা হয়, এবং তার সভা-পারিষদগণ এর কোন কূটনৈতিক উপায় বের করার বদলে স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের লাভের হিসাব নিকাশেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক

ভারতীয় কূটনীতির উপর অত্যধিক নির্ভরতা তাকে হয়তো এই ভুল ধারণায় পৌঁছে দিয়েছিল যে আরও আগ্রাসী অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি তার শাসনকে নিরাপদ করবে। কিন্তু এই কৌশল উল্টো ফল বয়ে আনে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ দখল করতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আছে—এরকম সংবেদনশীল বিষয়ে তার বক্তব্য পশ্চিমা শক্তিগুলোর বিরাগভাজন করে তোলে। আলোচনা বা কূটনীতিকে তিনি কখনোই সমঝোতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেননি—সম্ভবত তার সহযোগীদের ভুল পরামর্শের কারণেই। বরং তিনি মনে করতেন, আরও দমনপীড়নই বিরোধিদের নির্মূল করবে—একটি ধারণা যা রাজনৈতিক আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়।

ভুল কূটনীতির বিপদ

এক নজরে শেখ হাসিনার বৈদেশিক নীতির  অমার্জনীয় ভুলগুলো এরকম:

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের আন্তর্জাতিক খ্যতি এমনিতেই খারাপ। নিজস্ব মানবাধিকারের সংকট ও সীমিত ধর্ম নিরপেক্ষতার কারনে ভারতের পক্ষে শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নতি করা একপ্রকার অসম্ভব ছিল। তাঁর উপর, বিভিন্ন  মেগা প্রকল্পে চীন, ভারত, জাপান, রাশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়াটা শেখ হাসিনার জন্য এক মরন ফাঁদের মতো হয়ে উঠে। পশ্চিমের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি এক চরম ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে।  সেন্ট মার্টিন্স নিয়ে অমূলক দাবি বা ড. ইউনুসের মতো ব্যক্তিত্বদের নিগ্রহের মতো কর্মকাণ্ড যা সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীদের দূরে ঠেলে দেয়।

কেন আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ?

কোন রাষ্ট্রে স্বৈর শাসন বলবত থাকলে সেই রাস্ট্রের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মিয়ানমারের  জান্তার সাথে যেমন চীন, সিরিয়ার আসাদের আছে যেমন রাশিয়া, নেতানিয়াহুর সাথে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেমনি একটা স্বৈর-সরকার শক্তিশালী মিত্রতা খোজে। শেখ হাসিনা তা অর্জনে ব্যর্থ হন। অতিরিক্ত ভারত মিত্রতা শেখ হাসিনাকে আদতে দুর্নাম ছাড়া কোন ফল এনে দিতে পারেনি। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্যকে শেখ হাসিনাকে একপেশে হিসেবেই প্রকাশ করে আন্তর্জাতিকভাবে।

চূড়ান্ত পতন

স্বৈরশাসকরা বহিঃবিশ্বের  স্বীকৃতি ও সহযোগিতার উপর নির্ভর করে টিকে থাকতে চান। যেহেতু নিজ দেশের জনগণকে সরকার আস্থায় নিতে পারছেন না সেহেতু প্রতিবাদীদের বিশ্বমঞ্চে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু ২০২৩ সাল থেকে ক্রমাগতভাবে চেষ্টা করেও রাষ্ট্রের ভিন্নমতধারীদের জঙ্গী বা সন্ত্রাসী হিসেবে বিশ্বকে প্রমাণ করতে শেখ হাসিনা ব্যর্থ হন । এই সংকট তার অন্যান্য ব্যর্থতা, যেমন, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, যুব বেকারত্ব, সুশাসনের অভাব, সামরিক বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ, দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও ঘনীভূত করে  এবং সর্বোপরি তাঁর শাসন করার বৈধতাকে দেশে বিদেশে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।  যখন আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে জুলাই আগস্টে—তাঁর বিরুদ্ধে পৃথিবীর সমর্থন জয় করা তো দুরেই থাক, একেবারেই উল্টো বিশ্ব-নেতৃত্ব এবং জাতিসংঘ তাঁর উপর থেকে স্থায়ীভাবে সমর্থন উঠিয়ে নেয়।

উপসংহার
যখন এইদেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারল যে, বিশ্ব আর তার "সন্ত্রাসী" তকমাকে মানছে না, তখনই তাঁরা সেই সুযোগকে আর হাত ছাড়া করতে চাইলো না। তাই আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির চুড়ান্ত সংকট তাঁর শাসক হিসেবে চালিয়ে যাবার চূড়ান্ত আঘাত। একটি সরকারের বৈধতা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং বৈদেশিক স্বীকৃতির উপরও নির্ভরশীল। এই বৈশ্বিক ইঙ্গিতই আন্তর্জাতিক গণ মাধ্যমের কল্যাণে প্রতিবাদী আন্দোলনের পক্ষে শক্তি যুগিয়েছিল আর তাঁর আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। যখন শাসন আর প্রতিবাদীদের "সন্ত্রাসী" হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করতে পারল না, জনতা বুঝে গিয়েছিল সময় এসেছে। এবং এদেশের সকল স্তরের মানুষের ঢল নামে রাজপথে।

post-ads

জাতিসংঘই হাসিনার পতন ঘটিয়েছে? Zahed's Take । জাহেদ উর রহমান । Zahed Ur Rahman. This video is adequate a proof of international pressure on Sheikh Hasina and its impact on her eviction

In this interview in 2023 Sheikh Hasina was asked to respond to her reputation as an authoritarian leader. Facing such direct question by Yalda Hakim is perceived as an echo of the rest of the world talking about her.

In this interview soon after 2018 election in Bangladesh DW raises the question of the election anomalies which certainly were not properly explained by Sheikh Hasina. If you listen to the questions and the replies you would notice that the confusions abo

Sheikh Hasina - 'It is my struggle' to establish free elections

During an interview on Sunday with Laura Kuenssberg (BBC One, 18 September 2022), the Bangladeshi Prime Minister Sheikh Hasina faced pointed questioning about ensuring free and fair elections in Bangladesh, following widespread scrutiny of the 2018 results. Notably, this exchange occurred during her UK visit to attend Queen Elizabeth II’s state funeral. What proved particularly striking was Hasina’s attempt to deflect allegations by drawing parallels with perceived electoral irregularities in the UK itself—a remarkably ill-judged comparison for a visiting head of government. The interviewer’s visibly muted reaction underscored just how diplomatically inappropriate this deflection was. Yet such tough questioning has become a recurring theme in her international engagements. Her responses—ranging from dismissive comparisons to historical whataboutism (notably referencing past military regimes)—failed to address core democratic concerns. Most revealing was her tacit admission of electoral malpractices through equivocal justifications ("others did worse") rather than substantive rebuttals. This pattern of deflection and inadequate preparation suggests either a fundamental misunderstanding of democratic norms or a calculated avoidance of accountability—neither reflecting well on her office’s engagement with global scrutiny.

Bangladesh PM Sheikh Hasina‘s interview to ANI

This analysis bears the hallmarks of an Indian think tank, detailing their strategic cultivation of Sheikh Hasina and coaching her to reframe contentious debates by invoking the murder of her relatives—a recurrent deflection tactic.

Exclusive interview with Bangladeshi Prime Minister Sheikh Hasina (CGTN)

Chinese media once vied with Indian think tanks in flattering Sheikh Hasina, aiming to expand Chinese business interests in Bangladesh. For a time, this strategy proved effective—until it became apparent to the Chinese that her political days were numbered. Notably, Chinese media ceased interviewing her after 2019. It is worth noting what CGTN wrote as the description of the video: Jul 7, 2019 Bangladeshi Prime Minister Sheikh Hasina is visiting China from July 3 to 5, when she is expected to ink several agreements, focusing mostly on power generation and economic cooperation. CGTN reporter Liu Yang sat down with Hasina to hear more about her visit.

Aug 8, 2012 BBC HARDtalk Sheikh Hasina Prime Minister of Bangladesh.

The BBC’s HardTalk has long held leaders to account, but few interviews have aged as tellingly as its exchange with Sheikh Hasina. A decade on, the probing questions about governance and democracy still resonate—while her deflective answers remain equally emblematic of a leadership style that prioritises obfuscation over accountability.